ইউপিআই লেনদেনে মাশুল ধার্যের পথ প্রশস্ত: লোকসভায় পাস নতুন আইনি সংশোধনী

ইউপিআই লেনদেনে মাশুল ধার্যের পথ প্রশস্ত: লোকসভায় পাস নতুন আইনি সংশোধনী

ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম ‘ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ (ইউপিআই)-এর ওপর ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ (এমডিআর) বা সার্ভিস চার্জ আরোপের আইনি পথ প্রশস্ত করল কেন্দ্রীয় সরকার। বৃহস্পতিবার লোকসভায় বিরোধীদের হই-হট্টগোলের মধ্যেই কোনো আলোচনা ছাড়াই পাস হয়ে যায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের পেশ করা ‘ট্যাক্সেশন অ্যান্ড আদার ল’জ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এই বিলের মাধ্যমে ২০০৭ সালের ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট’-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

এই আইনি সংশোধনীর ফলে সরকার ভবিষ্যতে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ব্যাঙ্ক এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের নির্দিষ্ট ইলেকট্রনিক পেমেন্টের ক্ষেত্রে মাশুল বা সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ ও অনুমোদনের আইনি ক্ষমতা লাভ করল।

কী পরিবর্তন আসছে এবং কার ওপর প্রভাব পড়বে?

অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারে সরাসরি প্রভাব পড়বে না:

  • ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (P2P) লেনদেন: সাধারণ গ্রাহকদের পরস্পরের মধ্যে অর্থ লেনদেন আগের মতোই সম্পূর্ণ নিঃশুল্ক থাকবে।
  • ভোক্তাদের ওপর প্রভাব নেই: অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ স্পষ্ট করেছেন, এমডিআর বা সার্ভিস চার্জ কেবল ব্যবসায়ীদের (মার্চেন্ট) ওপর প্রযোজ্য হবে, সাধারণ ক্রেতা বা শেষ ব্যবহারকারীদের ওপর নয়।
  • নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লেনদেন: বার্ষিক দেড় কোটি টাকার বেশি টার্নওভার থাকা বড় বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির নির্দিষ্ট পরিমাণের (২,০০০ টাকার বেশি) লেনদেনের ওপর ভবিষ্যতে এই চার্জ কার্যকর হতে পারে।
  • ফিনটেক পরিকাঠামো উন্নয়ন: অর্থমন্ত্রীর মতে, এই সিদ্ধান্ত ব্যাঙ্ক ও ফিনটেক সংস্থাগুলিকে ডিজিটাল পরিকাঠামো, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সাইবার সুরক্ষায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।

বিরোধীদের তোপ ও বিতর্ক

আইন সংশোধনীর পর সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দাবি করেন:

১. সাধারণ মানুষের ওপর বোঝার আশঙ্কা: ইউপিআই লেনদেন যে আইনি সুরক্ষার কারণে এতদিন নিখরচায় হতো, মোদী সরকার সেই নিশ্চয়তা তুলে নিল। ভবিষ্যতে এই এমডিআর চার্জের অপ্রত্যক্ষ চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই এসে পড়বে।

২. উদ্বৃত্ত তহবিলের ব্যবহার না করা: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে কেন্দ্রকে ২ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তহবিল হস্তান্তরিত করেছে। তার একটি ক্ষুদ্র অংশ দিয়েও এই ডিজিটাল লেনদেন পরিকাঠামো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চালু রাখা সম্ভব ছিল।

৩. বিদেশি চাপ ও মার্কিন নীতি: আমেরিকান লেনদেনকারী সংস্থা ‘ভিসা’ ও ‘মাস্টার কার্ড’-কে সুবিধা পাইয়ে দিতে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের ‘ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ’ (USTR)-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের পরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ তোলেন।

বর্তমানে এনইএফটি (NEFT) এবং আরটিজিএস (RTGS)-এর মতো মাধ্যমে মাশুল প্রযোজ্য হলেও ইউপিআই সম্পূর্ণ নিঃশুল্ক থাকায় দেশে এর ব্যবহার ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছিল। আইন সংশোধনের মাধ্যমে পরোক্ষ সার্ভিস চার্জ চালু হলে নগদের ওপর নির্ভরতা ফের বাড়বে কিনা, তা নিয়ে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.