প্রথম পর্ব — মুক্তির আশা
১৯৪৪ সাল ছিল আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম মোড় ঘোরানো বছর। এশিয়া ও আফ্রিকায় বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের অন্তিমকালের সূচনা হচ্ছে সেই সময় আর অন্যদিকে বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার কেন্দ্র ইউরোপ থেকে সরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন -এর হাতে চলে যাচ্ছে। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিজাতীয় শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত।১৯৪৪ সালে রেড আর্মি (সোভিয়েত বাহিনী) পূর্ব ইউরোপে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তিধর দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু সেই কমিউনিস্ট পার্টির শাসনাধীন দেশ থেকে তাদেরই একজন ১৯৪৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘সোভিয়েত পারচেজিং কমিশন’ (Soviet Purchasing Commission/Lend-Lease Mission)-এ ধাতব প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ নিয়ে আমেরিকা পাড়ি দেয়। এই যাত্রা তাঁর কাছে কেবল একটি সরকারি সফর ছিল না, বরং স্ট্যালিনের স্বৈরাচারী শাসন থেকে চিরতরে মুক্ত হওয়ার একমাত্র সুবর্ণ সুযোগ ছিল।
যুদ্ধকালীন সময়ে কমিউনিস্টদের স্বর্গরাজ্যে সাধারণ মানুষের করুণ অবস্থার মধ্যে মস্কো ছাড়ার মুহূর্তে ভিক্টর ক্রাভচেঙ্কো তীব্র আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। এনকেভিডি (NKVD) বা সোভিয়েত গোপন পুলিশ প্রতিটি পদক্ষেপে নজর রাখছিল। তিনি জানতেন, যাত্রার শেষ মুহূর্তেও সামান্য সন্দেহের বশে তাঁর বিদেশযাত্রা বাতিল হতে পারে বা তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
মাতৃভূমি, পরিবার ও বন্ধুদের চিরতরে পিছনে ফেলে যাওয়ার যন্ত্রনায় তিনি ছটফট করছিলেন। তিনি জানতেন, যে গোপন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন (আমেরিকায় পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়া), তার পর তিনি হয়তো আর কোনোদিন দেশে ফিরতে পারবেন না। তাঁর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও বন্ধুদের নিরাপত্তাও তাঁর এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছিল।
সোভিয়েত জাহাজে করে প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় জাহাজের ভেতরেও সোভিয়েত এজেন্টদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। জাহাজের সহযাত্রীদের সামনে তাঁকে একজন অনুগত সোভিয়েত কর্মকর্তা হিসেবে অভিনয় করে যেতে হতো।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সেই সময়ে সোভিয়েত রাশিয়াতেও স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছে কিন্তু তা নিজের দেশেরই একনায়কতন্ত্র থেকে, এমন একটি মতবাদ থেকে যা সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে বর্তমান কে ধ্বংস করে দেয়। ডিক্টেটরশিপ কে সাম্য অর্জনের পথ হিসেবে দেখিয়ে সেই স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শস্য উৎপাদনকারী কৃষকদের অনাহারে রাখা হয় , নিজের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ কে কারাবন্দী করা হয়েছে, গণহত্যার সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া, এমনকি একই মতবাদে বিশ্বাসী লক্ষ লক্ষ নেতাদের হত্যা করা ঔপ্যনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের অত্যাচারকেও হার মানায়। কমিউনিস্ট ব্যবস্থার নৃশংসতা থেকে বেরিয়ে মুক্ত হওয়ার বাসনা শুধু নিজের জন্যই নয় , কমিউনিজমের আদর্শের দ্বিচারিতা সম্পর্কে দুনিয়া কে জানিয়ে নিজের দেশবাসীকে এই পাশবিক স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত করার পথ প্রশস্ত করাই ছিল ক্রাভচেঙ্কোর উদ্দেশ্য। স্বজাতীয় শাসকের দ্বারা বিশ্বের এই প্রান্তে একধরনের সমান্তরাল পরাধীনতা ভোগ করছে রাশিয়ার মানুষ যার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্ববাসী জানে না বরং সোভিয়েত প্রচারতন্ত্র সেই ব্যবস্থা কে সুখী পৃথিবীর একমাত্র উপায় বলে প্রতিষ্ঠিত করছে।
দেশছাড়া হওয়ার প্রাকমুহুর্তে ক্রাভচেঙ্কোর মনের কথা —
“
দেশ ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি—যে সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার তীব্র বঞ্চনা ও রাজনৈতিক দাসত্বের তিক্ত সত্য প্রকাশ করার স্বাধীনতা অর্জন এবং নিজের মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করা—আমার সত্তার অতল গহ্বরে এতটাই ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়েছিল যে, এটি কখন পুরোপুরি চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল তা আমি নিজেও জানতাম না। তবে বহু বছর ধরেই এটি একটি সচেতন পরিকল্পনা ছিল, যা কেবল একটি উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তটি যখন অবশেষে এল, আমি গভীর শোকে নিমজ্জিত হলাম। মৃত্যুর মতোই গভীর এক বিচ্ছেদের অনুভূতি আমাকে তীব্রভাবে ব্যথিত করছিল; মনে হচ্ছিল যেন আমাকে আমার নিজেরই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই মুহূর্তে আমি আমার দেশ ও আমার মানুষকে এমন এক তীব্র ও পুঞ্জীভূত আবেগে ভালোবাসছিলাম, যা সহ্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল”।
[The decision to leave, to find the freedom in which to tell the bitter truth about Russia’s privations and political slavery, in which to struggle for the liberation of my people, had matured so slowly in the depths of my being that I did not myself know when it took full shape. But for years now it had been a conscious plan, awaiting only a propitious moment. Yet now that the moment had arrived, I was steeped in sorrow. I was poignantly aware of a separation as deep as death, and I felt as if I were being conveyed to my own funeral. At this moment I loved my country and my people with a fierce focussing of emotion that was almost unbearable. ( Prelude to America, Page -453)]
১৯৪৩ সালের আগস্ট মাসে ক্রাভচেঙ্কো ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে পৌঁছান। তিনি ‘সোভিয়েত পারচেজিং কমিশন’ (Soviet Purchasing Commission)-এ একজন উচ্চপদস্থ কারিগরি প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই কমিশনের কাজ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ল্যান্ড-লিজ’ (Lend-Lease) চুক্তির অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়নে সরবরাহ করা সামরিক ও শিল্প সামগ্রীর তদারকি করা।
স্ট্যালিনের প্রজারা বিদেশেও স্বাধীন না। ক্রাভচেঙ্কোর মতো অন্যান্য রাশিয়ান আধিকারিক বিশ্বের অন্যতম স্বাধীন গণতন্ত্রের দেশে বসবাস ও কাজ করলেও নিজেদের মধ্যে তাঁরা সোভিয়েত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের ভীত-সন্ত্রস্ত নাগরিকের মতোই জীবনযাপন করতেন। আমেরিকানদের মতো স্বাধীনভাবে কথা বলা, সংবাদপত্র পড়া, নিজের মত প্রকাশ করা বা যাকে খুশি তার সঙ্গে দেখা করার অধিকার তাঁদের ছিল না।
তাঁদের কী ভাবতে হবে, কী পড়তে হবে এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে—সবকিছুই পার্টি ও গোপন নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। তাঁদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চলত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মতোই ছিল Party Committee, Party nuclei এবং Special/Secret Department।
প্রত্যেকের সম্পর্কে তথ্য ও কখনও মিথ্যা বা অপপ্রচারমূলক তথ্য গোপন নথিতে সংরক্ষণ করা হতো। ফলে আমেরিকার মুক্ত পরিবেশের মধ্যে এই ধরনের দমনমূলক ব্যবস্থা আরও অস্বাভাবিক, কুৎসিত ও ভয়াবহ বলে মনে হয়েছিল ক্রাভচেঙ্কোর।
আমেরিকাতে পা দিয়ে ক্রাভচেঙ্কো আশা করেছিলেন যে সোভিয়েত রাশিয়ার দমন-পীড়ন সম্পর্কে কিছুটা হলেও গুঞ্জন শোনা যাবে গণতান্ত্রিক আমেরিকায় — কিন্তু হতাশ হন।মস্কো থেকে আমেরিকান সাংবাদিকরা যে খবর পাঠাতেন, তাঁর মতে সেগুলোর বড় অংশই ছিল সোভিয়েত সরকারি সংবাদপত্রের খবরের পুনরাবৃত্তি। কারণ তাদের কাছে অন্য স্বাধীন তথ্যের উৎস খুব সীমিত ছিল। সোভিয়েত নাগরিকরা বহু বছর ধরে সরকারি সংবাদ পড়ে বুঝতে শিখেছিল—কোন কথার পিছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমেরিকান পাঠকদের সেই অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে সোভিয়েত সরকারের প্রচার ও মিথ্যাও আমেরিকায় সত্য বলে গ্রহণ করা হতো।সোভিয়েত জীবনের বাস্তবতা আমেরিকায় অনেকটাই অজানা ছিল।
ক্রাভচেঙ্কো বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন যে আমেরিকার বহু মানুষ সোভিয়েত ব্যবস্থার ভয়াবহ বাস্তবতা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না।
১৯৪৪ সালের ৪ এপ্রিল ক্রাভচেঙ্কো তাঁর ঐতিহাসিক দলত্যাগের (Defection) ঘোষণা দেন।
তিনি হঠাৎ সোভিয়েত মিশন থেকে অন্তর্ধান হন এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার মাধ্যমে একটি নাটকীয় বিবৃতি জারি করেন। সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের ঢক্বানিনাদের আড়ালে কমিউনিস্ট দেশের জোরপূর্বক শ্রম , পুলিশ-নির্ভর একনায়কতন্ত্র , ব্যাপক রাজনৈতিক হত্যালীলা, অত্যন্ত নিম্ন জীবনযাত্রার মান , যৌথ খামার ব্যবস্থার নৃশংসতা সম্পর্কে সারা বিশ্ব অজ্ঞাত ছিল। স্বজাতীয় শাসকের শাসনে পুরো সোভিয়েত রাশিয়া যে পরাধীনতা ভোগ করছিল তার খবর লৌহ যবনিকা ভেদ করতে পারতো না।বিদেশে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে Soviet propaganda অত্যন্ত সফল হয়েছিল। আমেরিকার অনেক মানুষ বাস্তব সোভিয়েত ব্যবস্থাকে তার প্রকৃত অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি আদর্শ ও সফল বলে মনে করত।
যারা সোভিয়েত ব্যবস্থার কিছু খারাপ দিক জানত, তাদের অনেকেই মনে করত—সমস্ত অত্যাচারের জন্য শুধু স্ট্যালিন দায়ী। তাঁদের আশা ছিল, স্ট্যালিন মারা গেলে বা ক্ষমতা থেকে সরে গেলে একটি সুন্দর “socialist democracy” প্রতিষ্ঠিত হবে। ক্রাভচেঙ্কো এই ধারণাকে ভুল আত্মপ্রবঞ্চনা বলে মনে করেন। তাঁর মতে, সমস্যাগুলি শুধু একজন ব্যক্তির কারণে নয়; সোভিয়েত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যেই অর্থাৎ কমিউনিস্ট ব্যবস্থার মধ্যেই দমন-পীড়নের প্রবণতা ছিল। তাই স্ট্যালিন মারা গেলেই সেই ব্যবস্থা শেষ হবে না—অন্য কোনো স্বৈরশাসক বা স্বৈরশাসকদের গোষ্ঠী একই ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে পারে। আর হয়েওছিল তাই। সোভিয়েত তথা কমিউনিস্ট শাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার অভ্যন্তরীণ দমননীতি নয়, বরং বিদেশে তার সম্পর্কে একটি আকর্ষণীয় কিন্তু বিকৃত ছবি তৈরি করতে সক্ষম হওয়া।
ক্রাভচেঙ্কো জানতেন যে মস্কোর অনুমোদনে তাঁকে কমিশনের স্থায়ী ও উচ্চপদে নিয়োগ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে তিনি একজন বিশ্বস্ত সোভিয়েত কর্মী হিসেবে আরও বড় পদ পেতে পারতেন।সেই উচ্চপদ অর্থহীন ছিল, কারণ ক্রাভচেঙ্কো মনে করতেন—সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে থাকলে তিনি নিজের জনগণের জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন না; বরং তাঁদের অত্যাচারীদেরই সাহায্য করতে হবে। তাই তিনি বিদেশে থেকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কাজ করার স্বাধীনতা বেছে নেন। এর জন্য তাঁকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নিজের পরিচয় গোপন রাখা, প্রাণহানির আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাতে হয়।
১৯৪৪ সালে তিনি সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সতর্ক করে ক্রাভচেঙ্কোর একটি বিবৃতি New York Times-সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলেন, ব্রিটেন ও আমেরিকার মিত্র বলে পরিচিত হলেও ক্রেমলিনের লক্ষ্য প্রকৃত গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে জার্মানির ঠেলায় , স্ট্যালিন যতই মিত্রশক্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের নাটক করুক না কেনো সারা পৃথিবীতে কমিউনিস্ট পার্টির রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তখনও স্ট্যালিন পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সোভিয়েত প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য ছিল স্ট্যালিনের। ক্রাভচেঙ্কো নিজের ছোটবেলা থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় কমিউনিজমের নামে , মার্ক্সবাদ – লেনিনবাদের নামে নিজের দেশের মানুষের যে অসহায়তা, পরাধীনতা দেখেছেন তার বিপদ সম্পর্কে সারা বিশ্বকে জানালেন। নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে তৈরি করা অভিযোগপত্র পড়ে ক্রাভচেঙ্কোর মনে হয়েছিল, সেখানে যে ধরনের totalitarian dictatorship, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দমন-পীড়নের বর্ণনা রয়েছে, তা সোভিয়েত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অনেকাংশে প্রযোজ্য। তাঁর বক্তব্য ছিল—কয়েকটি নাম পরিবর্তন করে “Nazi”-এর জায়গায় “Soviet” বসালে ক্রেমলিনের ব্যবস্থার একটি ছবি পাওয়া যায়।
সোভিয়েত ব্যবস্থার এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েও সেই পাশবিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর অন্তরাত্মার দীর্ঘদিনের বিরোধের জন্য তিনি মুক্তি চেয়েছিলেন, মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন নিজের দেশবাসী কে আর বিশ্ববাসীকে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের বিপদ সম্পর্কে অবগত করাতে চেয়েছিলেন —– সোভিয়েত গুপ্তচরদের নজরদারি এড়িয়ে আমেরিকাতেও প্রাণসংশয়ের আশঙ্কার মধ্যে তিনি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘I Chose Freedom: The Personal and Political Life of a Soviet Official’
প্রকাশ করেন।১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত প্রকাশনী Charles Scribner’s Sons থেকে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।প্রকাশের পরপরই এটি আন্তর্জাতিক বেস্টসেলারে পরিণত হয়। ইংরেজি ছাড়া ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশসহ অন্তত ৪০টিরও বেশি ভাষায় বইটি অনূদিত হয়েছিল।পশ্চিমের যেসব বুদ্ধিজীবী সোভিয়েত সমাজতন্ত্রকে আদর্শ মনে করতেন, ক্রাভচেঙ্কোর এই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ তাদের মোহভঙ্গ ঘটায়। ক্রাভচেঙ্কো ঘোষণা করেন যে তিনি স্ট্যালিনের একনায়কত্ব, নাগরিক স্বাধীনতার অভাব এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে লাখ লাখ মানুষের ওপর চালানো নিগ্রহের প্রতিবাদে সোভিয়েত সরকারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়ার সাধারণ মানুষকে ভালোবাসেন, কিন্তু তাদের ওপর চেপে বসা অত্যাচারী কমিউনিস্ট শাসনের বিরোধিতা করছেন। নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ‘I choose freedom’ এ লিখেছেন —
“
বহুদিন ধরেই আমি জানতাম যে এই সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্তটি ছিল অবশ্যম্ভাবী। কয়েক মাস ধরে আমি এই পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম। এতদিন ধরে যে ভণ্ডামি, ক্ষোভ আর আত্মিক দ্বিধাদ্বন্দের গোলকধাঁধায় আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছি, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার এক পথ হিসেবেই আমি এর অপেক্ষায় ছিলাম। আমার দেশের শাসকগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে যে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর জন্য আমি অপরাধবোধে ভুগছিলাম, এই পদক্ষেপটি ছিল সেগুলোর জন্য আমার প্রায়শ্চিত্ত”।
[“For a long time I had known that this decisive hour was inevitable. months I had planned the flight. I had looked forward to it as a release from the maze of hypocrisies, resentments and confusions of spirit in which I had wandered for so many years. It was to be my expiation for horrors about which, as a member of the ruling class in my country, I felt a sense guilt.”]


