শান্তিনিকেতনের দমদমা গ্রামে স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত: সৌরশক্তিতে ভাগ্যবদল আদিবাসী মহিলাদের

শান্তিনিকেতনের দমদমা গ্রামে স্বনির্ভরতার নতুন দিগন্ত: সৌরশক্তিতে ভাগ্যবদল আদিবাসী মহিলাদের

বীরভূমের শান্তিনিকেতন থানার অন্তর্গত প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রাম দমদমা। মাটির ঘর আর সবুজ ঘেরা এই জনপদে এতদিন বেঁচে থাকার লড়াই ছিল অত্যন্ত সীমিত সুযোগের মধ্যে। তবে সেই চেনা ছবিটা এবার বদলে যাচ্ছে। ‘উৎকর্ষে আরোহন’ নামক একটি সংস্থার হাত ধরে গ্রামের ২৮ জন আদিবাসী মহিলা এখন স্বনির্ভরতার এক নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন।


প্রযুক্তির স্পর্শে নারী ক্ষমতায়ন

গ্রামের ২৮ জন মহিলাকে নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠী। সম্প্রতি সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সৌরশক্তি চালিত মশলা শুকানোর ড্রায়ার (Solar Spice Dryer) এবং মশলা গুঁড়ো করার উন্নত যন্ত্র। এই আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যেই এখন ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখছেন লক্ষ্মী কিস্কু, প্রতিমা হেমব্রম ও তারা মান্ডিরা।

গোষ্ঠীর মহিলারা ড্রায়ারে হলুদ, আদা ও তেজপাতা শুকিয়ে তা মেশিনে গুঁড়ো করছেন। এরপর নির্দিষ্ট প্যাকেটে সেই মশলা প্যাকেটজাত করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু করেছেন তাঁরা। গোষ্ঠীর সদস্য লক্ষ্মী কিস্কুর কথায়, “আগে ভাবতেই পারিনি আমরা নিজেরা কিছু তৈরি করে বিক্রি করতে পারব। এই উদ্যোগ আমাদের নতুন করে বাঁচার পথ দেখিয়েছে।”


অন্ধকার ঘুচিয়ে সৌর বিদ্যুতের আলো

এই উদ্যোগ শুধু মশলা তৈরির ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। ‘উৎকর্ষে আরোহন’-এর পক্ষ থেকে ওই ২৮টি পরিবারের প্রতিটি ঘরে বসানো হয়েছে একটি করে সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল (Solar PV Panel) ও বাল্ব। বীরভূমের এই গ্রামে যেখানে বিদ্যুতের সংযোগ ছিল অনিশ্চিত, সেখানে এখন রাতের অন্ধকারেও আলো জ্বলে উঠছে সৌরশক্তির সৌজন্যে। এর ফলে পরিবারগুলির দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে।


যৌথ উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ

সম্প্রতি ইনকাম ট্যাক্সের জয়েন্ট কমিশনার বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় এবং ‘উৎকর্ষে আরোহন’-এর কর্ণধার অনুপম মজুমদার এই যন্ত্রগুলির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অনুপম মজুমদার বলেন, “গ্রামের মহিলারা স্বনির্ভরতার এই নতুন স্বপ্ন দেখে অত্যন্ত উৎসাহিত। তাঁদের এই উদ্দীপনাই আমাদের আরও কাজ করতে অনুপ্রাণিত করছে।”

এই সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় ঘোষ ঠাকুর পরিবার। তাদের পারিবারিক বাসভবন ‘তপোবন’-এর একাংশ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এই যন্ত্রগুলি বসানোর জন্য। ওই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য তথা সৌর বিজ্ঞানী ঋচীক ঘোষ ঠাকুর স্বয়ং গ্রামের মহিলাদের এই ড্রায়ার ব্যবহারের কৌশল হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন। তিনি জানান, অনুদান হিসেবে পাওয়া এই প্রযুক্তি গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক পথকে সুগম করছে।


পরিবর্তনের আভাস

দমদমা গ্রামের এই সাফল্য আসলে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। যেখানে উন্নয়নের সুফল শুধু বড় শহরের গণ্ডিতে আটকে না থেকে গ্রামবাংলার মাটিতেও শিকড় গাড়ছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই লড়াইয়ে বীরভূমের আদিবাসী বধূরা আজ কেবল গৃহবধূ নন, বরং হয়ে উঠেছেন সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.