হিমবাহ ধসে বিপর্যস্ত নেপাল: মৃতের সংখ্যা ছাড়াল বারোশো, ক্ষতিপূরণের দাবিতে রাষ্ট্রপুঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

হিমবাহ ধসে বিপর্যস্ত নেপাল: মৃতের সংখ্যা ছাড়াল বারোশো, ক্ষতিপূরণের দাবিতে রাষ্ট্রপুঞ্জে যাওয়ার সিদ্ধান্ত

হড়পা বান ও হিমবাহ ধসের জেরে নেপালে মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত রয়েছে। দিন যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা। নেপাল সরকারের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মোট ১,২৫৯টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯৫টি দেহ শনাক্ত করে পরিজনদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত ৫,০৮৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

বিদেশি দূষণের অভিযোগ ও রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা হিমবাহ ধস এবং তার পরবর্তী এই বিধ্বংসী বিপর্যয়ের জন্য ভারত, আমেরিকা এবং চিন—এই তিন দেশের দূষণকেই দায়ী করেছে নেপাল। এই দেশগুলির পরিবেশগত ক্ষতিকারক ভূমিকার কারণে হিমালয়ে বিপর্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ তুলে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে বলেন্দ্র শাহের সরকার। এই দাবিতে খুব শীঘ্রই রাষ্ট্রপুঞ্জের দ্বারস্থ হতে চলেছে তারা। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে শুরু হতে যাওয়া রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ অধিবেশনে নেপালের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার পর এটিই হবে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর।

জেলাওয়ারি ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্ধারকার্য নেপাল সরকারের জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে চিতোয়ান (৩৫৫টি মৃতদেহ), নওয়ালপারসি পূর্ব (২১৮টি), নওয়ালপারসি পশ্চিম (২১২টি), নুয়াকোট (১৭৭টি), রাসুয়া (১২৭টি), গোর্খা (৭২টি), ধাদিঙে (৬০টি) এবং তানাহুন (৩৮টি)। এ ছাড়া অসংখ্য দেহাংশ এখনও অশনাক্ত রয়েছে।

বিপর্যয়স্থল থেকে এখনও পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় ১২,০৩৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। দুর্গতদের উদ্ধার ও সহায়তার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন ২১ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী। দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য সারা দেশে ৩,৮৪৪টি ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে। পাশাপাশি, দুর্যোগে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন করে সেতু ও যোগাযোগ টাওয়ার নির্মাণের কাজ চলছে।

২৬ আগস্টের মর্মান্তিক বিপর্যয় ও ভারতের ত্রাণ সহায়তা গত ২৬ আগস্ট নেপালের সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে হঠাৎ আসা হড়পা বানে কাদামাটি, পাথর ও হিমশীতল জলের তীব্র স্রোত নিমেষে তলিয়ে দেয় নিচু এলাকার লোকালয়। বহু ভারতীয় পর্যটকও এই ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। প্রথমে নেপাল সরকার বিদেশি সাহায্য নিতে অস্বীকার করলেও, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করে এবং ভারতকে উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়। সংবাদসংস্থা এএনআই সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবারও ভারতীয় বায়ুসেনার দুটি সি-১৩০জে বিমান ওষুধপত্র, ফরেন্সিক সরঞ্জাম এবং ২১ জন বিশেষজ্ঞ কর্মী নিয়ে নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এই নিয়ে নেপালে মোট ৬৮ টনেরও বেশি ত্রাণসামগ্রী পাঠাল ভারত।

সতর্কবার্তায় বিলম্ব ও প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ নেপালের সংবাদমাধ্যম ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে রাসুয়ার লেন্দে উপত্যকায় হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু দেশের ‘ডিজ়াস্টার ওয়ার্নিং’ ব্যবস্থা সঠিক সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। প্রায় ৩৮ মিনিট পর, অর্থাৎ সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বিপদসঙ্কেত পৌঁছায়। খনি ও ভূতত্ত্ব বিভাগ কম্পন টের পেলেও তা হিমবাহ ভাঙার কারণে হচ্ছে কি না, তা বুঝতে পারেনি। এছাড়া, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটেই স্যাব্রুবেসীতে নদীর জলস্তর মাপার যন্ত্রটি জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ার পরেও কেন দ্রুত সতর্কতা জারি করা হল না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। সামান্য আগে সতর্কবার্তা পেলে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মনে করা হচ্ছে।

তিব্বতে নতুন করে ভূমিকম্প এবং পরবর্তী আশঙ্কা বিপর্যয়ের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় বৃহস্পতিবার তিব্বতে ৫ মাত্রার একটি নতুন ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মাটির ১৪ কিলোমিটার গভীরে এর উৎসস্থল থাকায় ১১৬ কিলোমিটার দূরে উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠেও কম্পন অনুভূত হয়। চিনের বিজ্ঞানীরা আগেই সতর্ক করে জানিয়েছিলেন যে, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হ্রদগুলিতে প্রচুর জল জমে থাকায় ফের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তিব্বতের এই নতুন ভূকম্পন সেই আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে তুলেছে, যদিও এতে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির কোনও খবর পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.