রাজ্যের রেস্তরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য দফতরের অভিযান: ১,৫০০-র বেশি ফুড সেন্টারে অনিয়মের হদিশ

রাজ্যের রেস্তরাঁ ও খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য দফতরের অভিযান: ১,৫০০-র বেশি ফুড সেন্টারে অনিয়মের হদিশ

রাজ্যের বিভিন্ন রেস্তরাঁ, হোটেল এবং খাবারের দোকানে লাগাতার অভিযান চালাচ্ছে খাদ্যসুরক্ষা দফতর। গত দু’দিনের অভিযানে মোট ১,৭৩০টি ফুড সেন্টার স্বাস্থ্য ভবনের পরিদর্শনের আওতায় এসেছে, যার মধ্যে অন্তত ১,৫২৫টি প্রতিষ্ঠানে বড়সড় অনিয়ম ধরা পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। জনগণ ও দোকানের মালিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে সরকার।

জেলাওয়ারি পরিসংখ্যান ও শীর্ষ স্থান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় খাবারের দোকানগুলিতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ডায়মন্ড হারবার। খাদ্যসুরক্ষা অভিযানের প্রথম দিনে ৯০৬টি এবং দ্বিতীয় দিনে ৮২৪টি ফুড সেন্টারে অভিযান চালিয়েছেন আধিকারিকেরা। রাজ্যজুড়ে মোট ৯০১টি নমুনা সংগ্রহ করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার মোট ২১৫টি দোকানে অনিয়ম মিলেছে, যার মধ্যে শুধু ডায়মন্ড হারবারেই রয়েছে ১৫৩টি দোকান। অন্যান্য জেলার মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনায় ১২৮টি, পূর্ব বর্ধমানে ১২৯টি, কলকাতায় ৯৬টি, কোচবিহারে ৮৩টি, বসিরহাটে ৭৭টি, পশ্চিম বর্ধমানে ৬৫টি, নদিয়ায় ৬০টি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫১টি দোকান চিহ্নিত করা হয়েছে।

নিন্মমানের খাবার ও লাইসেন্স বাতিল তদন্তে নেমে মোট ১,৫১৭টি জায়গায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১১টি দোকানে বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে, ৫টি দোকানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং ১৩টি দোকান সিল করে দেওয়া হয়েছে। আরও ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের প্রক্রিয়া চলছে।

  • মালদহ: জ়াইকা রেস্তরাঁ ও শ্রীকৃষ্ণ সুইট শপকে বারবার সতর্ক করার পরেও মান না-সোধায় দোকানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইংরেজবাজারের ‘কলকাতা আর্সালান বিরিয়ানি’-তে অস্বাস্থ্যকর মাংস ব্যবহারের অভিযোগে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রতুয়ার মা মনসা ওয়াটার প্ল্যান্ট, ঋত্বিকা ওয়াটার, অ্যাকোয়াতারা ওয়াটার সার্ভিস এবং আতিকা অ্যাকোয়া বুন্দের মতো প্যাকেজ়ড ড্রিঙ্কিং ওয়াটার সংস্থায় বৈধ লাইসেন্স না থাকায় ব্যবসা বন্ধ করা হয়েছে। নিউ রাজেশ ভুজিয়া সেন্টারে নিম্নমানের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটে তৈরির তারিখ না থাকায় পদক্ষেপ করা হয়েছে।
  • উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতা: মধ্যমগ্রামের স্টার মলে অবস্থিত ‘রং দে বসন্তী’ রেস্তরাঁয় বাসি মুরগির মাংস, মাছ, মেয়াদোত্তীর্ণ সামগ্রী এবং ছত্রাকযুক্ত লঙ্কার গুঁড়ো পাওয়ায় লাইসেন্স সাসপেন্ড করে দোকানটি বন্ধ রাখা হয়েছে। সল্টলেকের আরডিবি মলের ‘অ্যাবসলিউট বারবিকিউ নেশন’-এ বাসি খাবার ও রান্নাঘরে পোকামাকড়ের প্রমাণ মিলেছে। সেক্টর ফাইভের নবদিগন্তের কাঠি রোল এবং সোদপুরের ‘বারবিকিউ নেশন’-এও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। সল্টলেকের চৌরাসিয়া চাট্‌স এবং বহরমপুরের বিশ্বাস বেকারি ও পানিহাটির কয়েকটি মিষ্টির দোকানে মেটানিল ইয়েলো ও মেয়াদোত্তীর্ণ সামগ্রী ব্যবহারের দায়ে লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে। বিশ্বাস বেকারির প্যাকেজিংয়ে খবরের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক ব্যবহারের সতর্কতা ফুড সেফটি অফিসার সুমন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ঘরের জানলা বা গ্রিল রং করার কাজে ব্যবহৃত ‘মেটানিল ইয়েলো’ রাসায়নিকটি রান্নার হলুদ ও জিলিপিতে ভেজাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। লঙ্কার গুঁড়োতেও ক্ষতিকর রং মেশানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম ক্রেতা-বিক্রেতাদের উভয়কেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা ও নিয়ামক সংস্থা (এফএসএসএআই)-এর নতুন নিয়মগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। রাজ্যের ৩০টি মোবাইল ফুড ল্যাব এবং কলকাতার দুটি অত্যাধুনিক ল্যাবের মাধ্যমে এই নজরদারি চালানো হচ্ছে।

অন্যান্য অভিযান ও ব্লাড ব্যাংক সংক্রান্ত আপডেট হুগলী ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন হাসপাতালেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চুঁচুড়ার এক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরের মালিকানাধীন রেস্তরাঁ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঠান্ডা পানীয়, চিজ় এবং পচা মাংস উদ্ধার হওয়ায় ১৫ দিন সময় দিয়ে রান্নাঘর পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উত্তরপাড়ার মিষ্টির দোকানে দইয়ের পাত্রে মরা মাছি ও আরশোলা মেলায় অনেক মিষ্টি ফেলে দেওয়া হয়েছে। মগরা স্টেশন রোডের একটি বেকারিতে অতিরিক্ত মজুত চিনির হিসেব চাওয়া হয়েছে তিন দিনের মধ্যে। বকখালির হোটেল ও রেস্তরাঁ থেকেও বাসি খাবার ও ভেজাল সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ব্লাড ব্যাংক প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের ৭৩টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকের মধ্যে ৭১টিকে রক্তগ্রহণের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে ‘হেল্‌থ পয়েন্ট’ এবং ‘লাইফকেয়ার’ নামের দুটি ব্লাড ব্যাংক রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে যাওয়ায় তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি; এ বিষয়ে আদালতে শ্বেতপত্র পেশ করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি, মেডিক্যাল কলেজের পড়ুয়াদের রক্তদান শিবিরে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য দফতর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.