নন্দীগ্রামের পর এবার ভবানীপুর। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় পালাবদল ঘটিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দুর্গ ভবানীপুরে পরাজিত করলেন বিজেপি প্রার্থী তথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার এক টানটান উত্তেজনার গণনা শেষে শেষ হাসি হাসলেন শুভেন্দুই। ফলে নন্দীগ্রামের পর এবার খোদ কলকাতার হৃদপিণ্ডে দাঁড়িয়ে মমতাকে হারিয়ে নয়া নজির গড়লেন তিনি।
স্নায়ুর লড়াই: ২০ রাউন্ডের রোমহর্ষক উত্থান-পতন
সকাল থেকেই ভবানীপুরে দুই হেভিওয়েটের লড়াইয়ে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর চলে। ২০ রাউন্ডের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি ছিল অনেকটা এমন:
- প্রথম পর্ব: শুরুর দিকে কখনও মমতা, কখনও শুভেন্দু এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে দশম থেকে পঞ্চদশ রাউন্ড পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা লিড ধরে রেখেছিলেন।
- শুভেন্দুর কামব্যাক: সপ্তম রাউন্ড থেকেই নিঃশব্দে নিজের ভোট বাড়াতে শুরু করেন শুভেন্দু। ব্যবধান কমাতে কমাতে ষোড়শ রাউন্ডে তিনি মমতাকে ছাপিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেন।
সকালে নিজাম প্যালেস থেকে গণনাকেন্দ্র সাখাওয়াত মেমোরিয়ালে পৌঁছানোর সময় শুভেন্দু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিলেন, ভবানীপুরের জনবিন্যাস অনুযায়ী প্রথম দিকে পিছিয়ে থাকলেও শেষের দিকে তিনি জয়ী হবেন। তাঁর সেই ভবিষ্যৎবাণীই এদিন মিলে গেল।
গণনাকেন্দ্রে চরম উত্তেজনা: ‘লুট’ ও ‘বিজেপি কমিশন’-এর অভিযোগ মমতার
বিকেলের দিকে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সামনে উত্তেজনা চরমে ওঠে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গণনাকেন্দ্রে পৌঁছালে বিজেপি সমর্থকরা ‘চোর চোর’ স্লোগান তোলেন। সন্ধ্যাবেলায় গণনা শেষ হওয়ার আগেই ক্ষুব্ধ মমতা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বিস্ফোরক অভিযোগ করেন:
“আমাকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সিআরপিএফ-এর সামনে আমাকে ধাক্কা মারা হয়েছে, মারা হয়েছে। এটা একটা দানবিক পার্টি। এই নির্বাচন কমিশন আসলে বিজেপি কমিশন। ওরা ১০০-র বেশি আসন লুট করেছে।”
এই জয়কে ‘ইমরাল ভিক্ট্রি’ বা অনৈতিক জয় বলে অভিহিত করেন তিনি এবং জোর দিয়ে বলেন, তৃণমূল শীঘ্রই ঘুরে দাঁড়াবে।
শুভেন্দুর ‘ডাবল জয়’: বড়বোন ও মেজোবোন দুজনেই হাতছাড়া
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই ভবানীপুরকে ‘বড়বোন’ এবং নন্দীগ্রামকে ‘মেজোবোন’ বলে সম্বোধন করেন। পাঁচ বছর আগে মেজোবোনের (নন্দীগ্রাম) কাছে তিনি শুভেন্দুর হাতেই পরাস্ত হয়েছিলেন। এবার নিজের পাড়া তথা বড়বোনের (ভবানীপুর) ঘরেও শুভেন্দুর কাছে হার স্বীকার করতে হলো তাঁকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর কাছে এটি ছিল ‘রাজনৈতিক সুযোগ’ নেওয়ার লড়াই। ভবানীপুরের জন্য স্বয়ং অমিত শাহ প্রচারে নেমেছিলেন এবং বিজেপির পক্ষ থেকে পৃথক ইস্তাহারও প্রকাশ করা হয়েছিল।
ভবানীপুরের সমীকরণ: ‘এসআইআর’ ও জনবিন্যাসের প্রভাব
ভবানীপুরের এই পরাজয়ের পিছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ উঠে আসছে:
- ভোটার তালিকায় কাটছাঁট: নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ পর্বে এবার ভবানীপুর থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল, যা দুই পক্ষকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
- মিশ্র জনবিন্যাস: ‘মিনি ইন্ডিয়া’ খ্যাত ভবানীপুরে ৭৬ শতাংশ অমুসলিম ভোটার, যার মধ্যে ৩৪ শতাংশই অবাঙালি (গুজরাতি, পাঞ্জাবি, মাড়োয়ারি)। অন্যদিকে বাঙালির সংখ্যা ৪২ শতাংশ এবং মুসলিম ভোটার প্রায় ২৪ শতাংশ।
- প্রচারের অভাব: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সারা রাজ্য সামলাতে হওয়ায় তিনি ভবানীপুরে মাত্র ৭টি সভা করেছিলেন। অন্যদিকে, শুভেন্দু ১০টি সভা ও ব্যাপক জনসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিলেন।
নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরের এই জয় শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক কেরিয়ারে আরও একটি সাফল্যের পালক যোগ করল। অন্যদিকে, নিজের খাসতালুকে এই পরাজয় তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

