পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শ্রীরামপুর মহকুমার অন্তর্গত মাহেশ ভারতের অন্যতম প্রাচীন জগন্নাথ তীর্থ এবং বাংলার সর্বপ্রাচীন রথযাত্রার কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এখানে জগন্নাথদেব, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে এই উৎসব ধর্মীয় আচার, বৈষ্ণব ভক্তিধারা, লোকসংস্কৃতি এবং বাংলার সামাজিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। মাহেশের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের এক মূল্যবান ঐতিহ্য।
মাহেশের প্রাচীন পরিচয়-
মাহেশ গঙ্গার পশ্চিম তীরে অবস্থিত একটি প্রাচীন জনপদ। মধ্যযুগ থেকেই এটি নদীপথে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সপ্তগ্রাম, শ্রীরামপুর, চন্দননগর ও হুগলি অঞ্চলের সঙ্গে এর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পাশাপাশি বৈষ্ণব ধর্মচর্চারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মাহেশ। গঙ্গা-তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাধু-সন্ন্যাসী, তীর্থযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের সমাগম ঘটত, যা পরবর্তীকালে রথযাত্রার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
মাহেশে জগন্নাথদেবের প্রতিষ্ঠা-
মাহেশের জগন্নাথ মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে একটি সুপ্রচলিত কাহিনি রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী (কিছু প্রাচীন গ্রন্থে ধ্রুবানন্দ বা ধুবানন্দ নামেও উল্লেখিত) পুরীতে জগন্নাথদেবের দর্শনে গিয়েছিলেন। তিনি জগন্নাথের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। গভীর বেদনার মধ্যে তিনি স্বপ্নে জগন্নাথদেবের দর্শন লাভ করেন। স্বপ্নাদেশে তাঁকে বলা হয় যে, গঙ্গার তীরে মাহেশে গিয়ে জগন্নাথের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেই নির্দেশ অনুসারে তিনি মাহেশে ফিরে এসে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিয়মিত পূজা ও রথযাত্রার সূচনা করেন।
এই কাহিনি ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ হলেও ইতিহাসবিদরা মনে করেন যে, মধ্যযুগে উড়িষ্যা ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলেই জগন্নাথ উপাসনা বাংলায় বিস্তার লাভ করে। মাহেশ ছিল সেই বিস্তারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
রথযাত্রার সূচনা (১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ)-
প্রচলিত মতে, ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে মাহেশে প্রথম রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এই সালটি বাংলা ও ভারতীয় ধর্মীয় ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি পুরীর বাইরে জগন্নাথ উপাসনার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও সমসাময়িক শিলালিপি বা সরকারি দলিলের মাধ্যমে এই সালকে নিশ্চিত করা কঠিন, তবুও দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় ঐতিহ্য, মন্দিরের বংশানুক্রমিক বিবরণ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে এই সময়কালকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ফলে মাহেশের রথযাত্রা বাংলার সর্বপ্রাচীন রথযাত্রা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাব-
ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলায় বৈষ্ণব আন্দোলনের উত্থান মাহেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তি আন্দোলন সমগ্র বাংলায় জগন্নাথভক্তিকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। ঐতিহ্য অনুযায়ী, মহাপ্রভু নিজেও মাহেশে এসেছিলেন এবং জগন্নাথদেবের দর্শন করেছিলেন বলে বৈষ্ণব সমাজে বিশ্বাস প্রচলিত।
মহাপ্রভুর অন্যতম প্রধান পার্ষদ কমলাকর পিপলাই মাহেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি জগন্নাথ মন্দিরের সেবাপূজার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রথযাত্রাকে সুসংগঠিত রূপ দেন। তাঁর উদ্যোগে নিয়মিত পূজা, উৎসব, ভোগ, কীর্তন এবং তীর্থযাত্রীদের সেবার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আজও তাঁর বংশধরেরাই মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী সেবায়েত হিসেবে পরিচিত।
জমিদার ও দানশীল ব্যক্তিদের অবদান-
মুঘল যুগ এবং পরবর্তীকালে বাংলার বিভিন্ন জমিদার ও ধনী ব্যবসায়ীরা মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জমি দান, দেবোত্তর সম্পত্তি প্রদান, মন্দির সংস্কার, ভোগের ব্যয়ভার এবং রথ নির্মাণে তাঁরা আর্থিক সহায়তা করেন। এর ফলে মাহেশের রথযাত্রা একটি আঞ্চলিক ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে সমগ্র বাংলার অন্যতম প্রধান উৎসবে পরিণত হয়।
বর্তমান রথের নির্মাণ ইতিহাস-
প্রথম দিকের রথ ছিল সম্পূর্ণ কাঠের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের রথ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় নতুন রথ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৭৯৭ সালে কলকাতার বিশিষ্ট দানবীর শ্রীকৃষ্ণরাম বসু একটি বৃহৎ কাঠের রথ নির্মাণে অর্থসাহায্য করেন।
পরবর্তীকালে কাঠের রথটি অগ্নিকাণ্ড ও প্রাকৃতিক ক্ষতির কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ আমলে কলকাতার বিখ্যাত প্রকৌশল সংস্থা Martin & Burn Company-এর তত্ত্বাবধানে বর্তমান লোহার কাঠামোর রথ নির্মিত হয়। এই রথটি প্রকৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশাল লোহার ফ্রেম, বহু চাকা এবং উচ্চ কাঠামো নিয়ে এটি বাংলার অন্যতম বৃহত্তম রথ। প্রতি বছর ঐতিহ্য অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষ রশি টেনে এই রথ টানেন।
ঔপনিবেশিক যুগে মাহেশের রথযাত্রা-
অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় পর্যটক, মিশনারি এবং ব্রিটিশ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মাহেশের রথযাত্রার উল্লেখ করেছেন। নদীপথে কলকাতা, চন্দননগর, ব্যান্ডেল, হুগলি এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল মেলার আয়োজন হতো, যেখানে ধর্মীয় সামগ্রীর পাশাপাশি হস্তশিল্প, মাটির খেলনা, লোকজন সামগ্রী, মিষ্টি এবং বিভিন্ন গ্রামীণ পণ্যের বাণিজ্য চলত। ফলে মাহেশের রথযাত্রা স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
বাংলা সাহিত্য ও মাহেশের রথ-
মাহেশের রথযাত্রা বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর রাধারাণী উপন্যাসে মাহেশের রথের মেলার বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছেন। সেখানে জনসমাগম, মেলার পরিবেশ, মানুষের আবেগ এবং সামাজিক জীবনের এক প্রাণবন্ত ছবি পাওয়া যায়। এছাড়াও বহু ভ্রমণকাহিনি, সাময়িকপত্র এবং লোকসাহিত্যে মাহেশের রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের সাক্ষ্য বহন করে।
আধুনিক যুগে মাহেশের রথযাত্রা
বর্তমানে মাহেশের রথযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। লক্ষাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অগ্নিনির্বাপণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসেবার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সরাসরি সম্প্রচার, ডিজিটাল প্রচার এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার সংযোজন ঘটলেও শতাব্দীপ্রাচীন ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি আজও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়।
মাহেশের রথযাত্রার ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের ইতিহাস নয়; এটি বাংলায় জগন্নাথ উপাসনার বিকাশ, বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রসার, গঙ্গাতীরবর্তী জনপদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং বহু শতাব্দীর লোকঐতিহ্যের এক অনন্য দলিল। ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর প্রতিষ্ঠিত ভক্তিধারা, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও কমলাকর পিপলাইয়ের প্রভাব, জমিদার ও দানশীল ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা, ঔপনিবেশিক যুগের পরিবর্তন এবং আধুনিক সমাজের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে মাহেশের রথযাত্রা আজ এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। প্রতি বছর রথের রশি টানতে গিয়ে অসংখ্য ভক্ত কেবল একটি কাঠামোকে এগিয়ে নিয়ে যান না; তাঁরা বহন করে চলেন প্রায় ছয় শতাব্দীর এক অমর ঐতিহ্য, যা ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতিকে একই সূত্রে বেঁধে রেখেছে। এই ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছেও সমান শ্রদ্ধা ও মর্যাদায় সংরক্ষিত থাকবে—এই প্রত্যাশাই সকলের।
এই চিরন্তন ভক্তিধারার মর্মকথা যেন প্রতিধ্বনিত হয় জগন্নাথাষ্টকের অমর প্রার্থনায়—
“जगन्नाथस्वामी नयनपथगामी भवतु मे॥”
“জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।”
অর্থ:
“হে জগন্নাথ স্বামী, আপনি চিরকাল আমার দৃষ্টিপথে, আমার হৃদয়ের সম্মুখে এবং আমার জীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে বিরাজ করুন।”

