বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার পর প্রথমবার রাজ্য সফরে এসে অমিত শাহ যে রণকৌশল প্রদর্শন করলেন, তাতে বঙ্গ বিজেপির অন্দরে শুভেন্দু অধিকারীর ‘ওজন’ নিয়ে জল্পনা এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেল। যদিও দলগতভাবে বিজেপি এখনও কোনো মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি, তবে শাহের বক্তব্যে এবং দলের প্রকাশিত ‘চার্জশিট’-এ শুভেন্দুর বিশেষ উল্লেখ আগামীর সমীকরণ স্পষ্ট করে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
‘জনতার চার্জশিট’ ও শুভেন্দুর ওপর হামলা
শনিবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনকালের বিরুদ্ধে একটি ৪০ পৃষ্ঠার ‘চার্জশিট’ বা অভিযোগপত্র প্রকাশ করেন। অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং নারী নিরাপত্তার মতো ১৫টি অধ্যায়ে ভাগ করা এই নথিতে তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করা হয়েছে।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ‘গণতন্ত্রের ওপর আঘাত’ শীর্ষক অধ্যায়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ওপর হামলার কথা। শাহ তাঁর বক্তব্যেও মনে করিয়ে দেন, “পশ্চিম মেদিনীপুরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ওপর তৃণমূল কর্মীরা হামলা চালিয়েছে।” রাজ্য বিজেপির অনেক শীর্ষনেতা বিভিন্ন সময় আক্রান্ত হলেও, চার্জশিটে এবং শাহের মুখে শুভেন্দুর নাম আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে দলের একাংশ।
শাহের মুখে শুভেন্দুর ত্রিমুখী প্রশংসা
এদিনের কর্মসূচিতে অমিত শাহ তিনবার শুভেন্দুর ভূমিকার প্রশংসা করেন:
- জনসংযোগ: শাহ বলেন, রাজ্যের অরাজকতা ও অনুপ্রবেশের সঙ্কটের কথা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগেই পুরো পশ্চিমবঙ্গ সফর করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।
- সাফল্যের খতিয়ান: ২০১৬ সালে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপি ২০২১ সালে ৩৮ শতাংশে পৌঁছানোর কৃতিত্ব দিতে গিয়ে শাহ ‘শুভেন্দুজি’-র নেতৃত্বাধীন ৭৭ জন বিধায়কের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।
- আক্রমণাত্মক মেজাজ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে উৎখাত করার লড়াইয়ে শুভেন্দুর লড়াকু মানসিকতাকে দরাজ সার্টিফিকেট দেন শাহ।
সাংগঠনিক গুরুত্ব ও প্রার্থী চয়ন
বিজেপি সূত্রের খবর, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী তালিকায় শুভেন্দু অধিকারীর প্রভাব স্পষ্ট। অন্তত ১০০টি আসনে প্রার্থীর নাম শুভেন্দুর সুপারিশ মেনেই চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদব বা সুনীল বনসলদের কাছেও শাহের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া নন্দীগ্রামের পাশাপাশি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র ভবানীপুরেও শুভেন্দুকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক ওজনকেই প্রমাণিত করে।
নেতৃত্বের সমীকরণ
মঞ্চে রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এবং শমীক ভট্টাচার্য উপস্থিত থাকলেও, শাহের বক্তব্যে সুকান্তবাবুর পদের উল্লেখ থাকলেও নাম মুখে আনেননি। বিপরীতে, শুভেন্দুর নাম বারবার উচ্চারিত হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি সাধারণত নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ ঘোষণা করে না, তবে এদিনের কর্মসূচির পর স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গের ভোট ময়দানে শুভেন্দু অধিকারীকেই দলের ‘প্রধান মুখ’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
শাহের এই সফর এবং ‘চার্জশিট’ প্রকাশের পর বঙ্গ বিজেপির অন্দরে এখন একটাই আলোচনা— আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না হলেও, লড়াইয়ের রাশ কার্যত শুভেন্দুর হাতেই তুলে দিল দিল্লি।

