২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA)-র ওপর আইনি ও প্রশাসনিক চাপ ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনিতেই বিশ্বকাপের টিকিটের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা চলছিল, এবার সেই আবহেই ফিফার বিরুদ্ধে অফিশিয়াল তদন্ত শুরু করতে চলেছে আমেরিকার আদালত। মার্কিন আদালতের স্পষ্ট দাবি, সাধারণ দর্শকদের কাছ থেকে টিকিটের যে মাত্রাতিরিক্ত দাম নেওয়া হয়েছে, তা চরম অবিচারের শামিল।
ক্রেতা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ: তদন্তে নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি
নিউ ইয়র্ক এবং নিউ জার্সির সরকারি আইনজীবীরা যৌথভাবে জানিয়েছেন, ফিফার এই বিতর্কিত টিকিট বণ্টন প্রক্রিয়া মার্কিন ক্রেতা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালানো হবে।
সরকারি আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি মিলিয়ে বিশ্বকাপের মোট আটটি হাইপ্রোফাইল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় ফুটবলপ্রেমীরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন যে তাঁদের নিজেদের দেশে, নিজেদের শহরে বিশ্বকাপের আসর বসবে। কিন্তু টিকিটের অতিরিক্ত দামের কারণে এখন খোদ শহরের বাসিন্দারাই গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন।
এই তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফার ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা ‘বৈচিত্রপূর্ণ দাম’-এর নীতি। এই বিতর্কিত নীতি অনুযায়ী, টিকিটের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিটের দামও কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়, যার তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন আইনজীবীরা।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ফাইনাল ঘিরে অনিশ্চয়তা
নিউ ইয়র্কের ক্রেতা এবং কর্মী সুরক্ষা দফতরের (Department of Consumer and Worker Protection) সঙ্গে হাত মিলিয়ে এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছেন সরকারি আইনজীবীরা। মূলত নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামের (MetLife Stadium) ম্যাচগুলি নিয়েই এই তদন্ত চালানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই ঐতিহাসিক মাঠেই আগামী বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে ফাইনাল সহ অন্যান্য ম্যাচের টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের এতটাই বাইরে চলে গেছে যে, খোদ আয়োজক শহরের ফুটবলপ্রেমীরাই ম্যাচ দেখতে যাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিটিয়া জেমস এই বিষয়ে কড়া মনোভাব ব্যক্ত করে বলেন:
“নিউ ইয়র্কবাসী বহু বছর ধরে চাতকের মতো অপেক্ষা করছিলেন যে কবে তাঁদের শহরে বিশ্বকাপের ম্যাচ হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসেবে কম দামের টিকিটে ম্যাচ দেখার ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে জোরপূর্বক দর্শকদের পকেট কেটে বেশি দামে টিকিট কিনতে বাধ্য করানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
স্টেডিয়ামের ভুয়া মানচিত্র দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ
টিকিটের চড়া দামের পাশাপাশি ফিফার বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকারীদের দাবি, টিকিট বিক্রির সময় ফিফা ডিজিটাল মাধ্যমে স্টেডিয়ামের যে আসন বিন্যাস বা মানচিত্র (Stadium Map) প্রদর্শন করেছিল, বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অনেক দর্শক মাঠের একেবারে কাছাকাছি (VIP বা প্রিমিয়াম জোন) আসনের জন্য চড়া মূল্যে টিকিট কেটেছেন। কিন্তু টিকিট বুকিংয়ের পর দেখা যাচ্ছে, আদতে সেই আসনগুলি মাঠ থেকে বহু দূরে, গ্যালারির একেবারে পিছনের সারিতে অবস্থিত। ফিফার এই বিভ্রান্তিকর মানচিত্র প্রদর্শন এবং দর্শকদের ঠকানোর এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি নিয়েও বর্তমানে মার্কিন আদালত অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে।
বিশ্বকাপের মতো একটি মেগা ইভেন্টের প্রাক্কালে আমেরিকার মাটিতে আয়োজক সংস্থার এমন আইনি জটিলতায় জড়ানোয় ফিফার ভাবমূর্তি বড়সড় ধাক্কা খেল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

