দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মডেল ও অভিনেত্রী ত্বিশা শর্মার রহস্যমৃত্যু মামলায় এক বড়সড় মোড় এল। এই মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত তথা ত্বিশার শাশুড়ি— মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন জেলা বিচারক গিরিবালা সিংকে গ্রেফতার করল সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI)। বৃহস্পতিবার ভোপালের কাতারা হিলসে অবস্থিত তাঁর নিজস্ব বাসভবন থেকে গিরিবালা সিংকে হেফাজতে নেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট প্রাক্তন এই বিচারকের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার ঠিক পরদিনই সিবিআই এই পদক্ষেপ করল।
নিম্ন আদালতের ‘তাড়াহুড়ো’ এবং হাইকোর্টের কড়া অবস্থান
গত ১২ মে ভোপালে নিজের শ্বশুরবাড়ি থেকে ৩৩ বছর বয়সী মডেল-অভিনেত্রী ত্বিশা শর্মার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। এর ঠিক তিন দিন পর, অর্থাৎ ১৫ মে এফআইআর (FIR) দায়ের হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোপাল জেলা আদালত গিরিবালা সিংকে আগাম জামিন মঞ্জুর করেছিল। নিম্ন আদালতের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়।
বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত চলা ম্যারাথন শুনানির পর মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি দেবনারায়ণ মিশ্রের সিঙ্গল বেঞ্চ গিরিবালার আগাম জামিন বাতিলের ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট তার ১৭ পাতার রায়ে স্পষ্ট জানায়, নিম্ন আদালত কেস ডায়েরি এবং প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে না দেখেই অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে জামিন মঞ্জুর করেছিল, যা আইনত সঠিক ছিল না।
শুনানি চলাকালীন দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এবং রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল প্রশান্ত সিং আদালতে সওয়াল করে জানান যে, অভিযুক্ত গিরিবালা সিং নিজে দীর্ঘকাল বিচার ব্যবস্থার শীর্ষ স্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নিজের প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন এবং তদন্তে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করছেন না।
‘চরিত্র হনন’ ও প্রভাব খাটানোর বিস্ফোরক অভিযোগ
মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ার পর, কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং মৃত ত্বিশার পরিবারের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরা আদালতে প্রাক্তন বিচারকের বিরুদ্ধে একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন। সিবিআই-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়:
- জেলা আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর গিরিবালা সিং গণমাধ্যমে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়ে মৃত পুত্রবধূর ‘চরিত্র হনন’ করার চেষ্টা করেছেন।
- তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দেন।
- ঘটনার দিন ত্বিশার ময়নাতদন্তের সময় গিরিবালার বোন (যিনি নিজে একজন প্রভাবশালী চিকিৎসক) সশরীরে উপস্থিত ছিলেন, যা চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্টে প্রভাব খাটানোর চেষ্টার শামিল।
জোরপূর্বক গর্ভপাত, পণপ্রথা ও ময়নাতদন্তের চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট
তদন্তে নেমে সিবিআই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট উদ্ধার করেছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ত্বিশা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তাঁর স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা তাঁর চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটাতেন। গর্ভস্থ সন্তান অন্য কারও— এই অপবাদ দিয়ে ত্বিশাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করাতে বাধ্য করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নয়ডার বাসিন্দা মডেল-অভিনেত্রী ত্বিশার সঙ্গে ভোপালের প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান তথা পেশায় আইনজীবী সমর্থ সিংয়ের বিয়ে হয়। অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই ত্বিশার পরিবারের ওপর ক্রমাগত পণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। এমনকি বিয়ের পর ‘বিদায়’ অনুষ্ঠানের সময়ও জোর করে ২ লক্ষ টাকা আদায় করেছিল সমর্থের পরিবার।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট: প্রথম দেখায় ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও, ত্বিশার ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। রিপোর্টে জানা গেছে, তাঁর শরীরে আত্মহত্যার বাইরেও অন্তত ৬-৭টি গভীর আঘাতের চিহ্ন (Antemortem injuries) ছিল। বিশেষ করে তাঁর কনুই, কবজি এবং মাথায় এই আঘাতের দাগগুলি পাওয়া গেছে, যার কোনো সদুত্তর গিরিবালা সিং বা তাঁর পরিবার সিবিআই-এর কাছে দিতে পারেননি।
কঠোর ধারায় মামলা রুজু
ত্বিশার স্বামী সমর্থ সিং ইতিমধ্যেই সিবিআই হেফাজতে রয়েছেন। এবার তাঁর মা গিরিবালা সিংকেও গ্রেফতার করল কেন্দ্রীয় সংস্থা। সিবিআই বর্তমানে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর পণপ্রথায় মৃত্যু (ধারা ৮০), নির্যাতন (ধারা ৮৫) এবং যৌথ অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় এই মামলার তদন্ত চালাচ্ছে। এই হাইপ্রোফাইল গ্রেফতারির পর ত্বিশা শর্মা মৃত্যু মামলায় আরও বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসবে বলে মনে করছে দেশের আইন মহল।

