এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনার নেপথ্যে কি ফুয়েল সুইচের গলদ? সিয়াটলে বোয়িং-এর কারখানায় পরীক্ষায় বসছে ভারতের ডিজিসিএ

এয়ার ইন্ডিয়ার ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনার নেপথ্যে কি ফুয়েল সুইচের গলদ? সিয়াটলে বোয়িং-এর কারখানায় পরীক্ষায় বসছে ভারতের ডিজিসিএ

গত বছর গুজরাতের আমদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ‘বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার’ বিমানের ভয়াবহ দুর্ঘটনার আসল কারণ অনুসন্ধানে এবার সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিচ্ছেন ভারতীয় বিমান চলাচল নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA)-র বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন বিমান নির্মাতা সংস্থা বোয়িং-এর আমেরিকার সিয়াটলে অবস্থিত মূল কারখানায় গিয়ে বিমানের জ্বালানি (ফুয়েল) নিয়ন্ত্রণ সুইচ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’ (Reuters) এই চাঞ্চল্যকর খবরটি সামনে এনেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ জুন আমদাবাদ বিমানবন্দরে এয়ার ইন্ডিয়ার ওই ড্রিমলাইনার বিমানটি (ফ্লাইট এআই১৭১) এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল, যাতে বিমানকর্মীসহ মোট ২৬০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। প্রাথমিক তদন্ত ও ব্ল্যাক বক্সের রিপোর্টে দুর্ঘটনার নেপথ্যে বিমানের ফুয়েল সুইচে যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কাজনক তথ্য সামনে এসেছিল। এছাড়া গত বছরেরই ৩১ জুলাই লন্ডন বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ঠিক আগেও এয়ার ইন্ডিয়ার অন্য একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সুইচে একই ধরনের গোলযোগ ধরা পড়েছিল।

“কেন তুমি বন্ধ করে দিলে?” — ককপিটের শেষ কথোপকথনে রহস্য

আমদাবাদ দুর্ঘটনার পর কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ (AAIB) ১৫ পাতার একটি বিশদ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেই রিপোর্টে দুর্ঘটনার ঠিক আগের মুহূর্তে ককপিটে থাকা দুই পাইলটের মধ্যকার শেষ কথোপকথনের একটি রোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (CVR) অনুযায়ী, এক পাইলট অন্যজনকে প্রশ্ন করছেন, “কেন তুমি বন্ধ (জ্বালানি সুইচ) করে দিলে?” জবাবে অপর পাইলট বলছেন, “আমি কিছু বন্ধ করিনি।”

এয়ার ইন্ডিয়ার ওই অভিশপ্ত বিমানটিতে প্রধান চালক তথা ক্যাপ্টেন ছিলেন সুমিত সবরওয়াল (৫৬) এবং ফার্স্ট অফিসার তথা কো-পাইলট ছিলেন ক্লাইভ কুন্দর (৩২)। দুর্ঘটনায় দু’জনেই প্রাণ হারান। রিপোর্টে কে কাকে এই প্রশ্ন করেছিলেন তা স্পষ্ট না হলেও, বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, উড্ডয়নের (Take-off) মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক পাইলট কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে ইঞ্জিনের প্রধান জ্বালানি সুইচ বন্ধ করতে পারেন না।

আকস্মিক বা দুর্ঘটনাবশত ফুয়েল সুইচ ‘কাট অফ’ হওয়া অসম্ভব

সংবাদসংস্থা পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক অভিজ্ঞ বাণিজ্যিক বিমানচালক জানিয়েছেন, বিমানের ফুয়েল সুইচ ভুল করে বা অসাবধানতাবশত বন্ধ হয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব।

তিনি এর যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে বলেন, বিমানের ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয় এই বিশেষ সুইচের মাধ্যমে। এর মূলত দুটি অবস্থান (Position) থাকে— একটি ‘রান’ (Run) এবং অন্যটি ‘কাট অফ’ (Cut-off)। সুইচ ‘রান’-এ থাকলে ইঞ্জিনে তেল পৌঁছায় এবং ‘কাট অফ’ করলে সরবরাহ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়। এই সুইচগুলি নির্দিষ্ট দাগ দিয়ে ককপিটে চিহ্নিত করা থাকে এবং এদের পজিশন বদলাতে গেলে প্রথমে লিভারটি নিজের দিকে টানতে (Pull) হয়, তারপর ঘোরানো যায়। ফলে কোনো কিছুর ধাক্কা লেগে বা ভুলে এটি বন্ধ হতে পারে না।

গিয়ার আপের মারাত্মক বিভ্রান্তি ও শেষ মুহূর্তের মরিয়া চেষ্টা

বিমানের ককপিটের লে-আউট অনুযায়ী, জ্বালানি সুইচের ঠিক ওপরেই থাকে ‘থ্রাস্ট লিভার’ (যা গাড়ির অ্যাক্সিলারেটর প্যাডেলের মতো কাজ করে)। উড্ডয়নের সময় থ্রাস্ট লিভার নিচের দিকে নামানো থাকে এবং গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা খোলা হয়।

অভিজ্ঞ পাইলটটির অনুমান, বিমান যখন মাটি ছাড়ে, তখন চাকার সেন্সর সিগন্যাল দেয় যে বিমানটি এখন বাতাসে ভাসছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই সময় ক্যাপ্টেনের ‘গিয়ার আপ’ (বিমানের চাকা ভেতরে ঢোকানো) বলার কথা এবং কো-পাইলটের গিয়ার লিভার ওপরে তোলার কথা। কিন্তু তদন্ত রিপোর্টে পাইলটদের মুখে ‘গিয়ার আপ’ শব্দটি শোনা যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সম্ভবত অন্ধকারে বা চরম ব্যস্ততায় চাকা ওপরে তোলার জন্য ‘গিয়ার লিভার’ খুঁজতে গিয়ে ভুলবশত ঠিক তার নিচে থাকা ফুয়েল সুইচে হাত পড়ে যায় এবং সেটি টান পড়ে ‘কাট অফ’ হয়ে যায়।

যখন অন্য পাইলট বিষয়টি বুঝতে পারেন, ততক্ষণে বিমানের গতি স্তব্ধ হয়ে গেছে। তদন্ত রিপোর্ট বলছে, পাইলটরা শেষ মুহূর্তে অত্যন্ত মরিয়া হয়ে দুটি ইঞ্জিনের ফুয়েল সুইচই আবার ‘কাট অফ’ থেকে ‘রান’-এ ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং ইঞ্জিন চালু করার শেষ চেষ্টা করেছিলেন। এর ফলে ২ নম্বর ইঞ্জিনটি সাময়িকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে এলেও, ১ নম্বর ইঞ্জিনটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

ঠিক কোন নকশাগত ত্রুটি বা যান্ত্রিক বিভ্রান্তির কারণে বোয়িং-এর মতো অত্যাধুনিক বিমানের ফুয়েল সুইচ উড্ডয়নের মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলো, তা অকুস্থলে গিয়ে খতিয়ে দেখতেই বোয়িং-এর সিয়াটল দফতরে যাচ্ছেন ভারতের ডিজিসিএ-র উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.