সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসে লিখেছিলেন ‘দুই নারী, হাতে তরবারি’। প্রেক্ষাপট ছিল বাঙালি মহিলাদের মার্কিন প্রবাস জীবন। ঘটনাচক্রে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সরকার গড়েছে বিজেপি। আর এই নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গ বিজেপির অন্দরে এখন এক নতুন আখ্যানের জন্ম হয়েছে। তবে এখানে ‘দুই নারী’ নন, আলোচনার ভরকেন্দ্রে রয়েছেন ‘তিন নারী’— তথা রাজ্য বিজেপির তিন দাপুটে ‘পদ্মাবতী’।
রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার আগে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং অগ্নিমিত্রা পাল— তিন জনেই ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। প্রথম দু’জন চলচ্চিত্র জগতের প্রথম সারির অভিনেত্রী এবং শেষের জন একজন খ্যাতনামা ফ্যাশন ডিজাইনার। স্বভাবতই রাজনীতির অন্দরমহলে একসময় তাঁরা ছিলেন ‘প্রবাসী’। কিন্তু গত এক দশকে নিজেদের রাজনৈতিক দক্ষতায় তিন জনেই একে একে বিজেপির মহিলা মোর্চার রাজ্য সভানেত্রী হয়েছেন এবং দলের অগ্রগণ্য মহিলা ‘মুখ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তবে ১০ বছরের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর, দল যখন এ রাজ্যে ১ নম্বরে, তখন তিন দেবীর পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে গেলেন, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে পদ্মশিবিরে।
শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় ‘নাম্বার থ্রি’ অগ্নিমিত্রা: ক্ষমতার শীর্ষে নব্য মুখ
বিজেপির অন্দরের সমীকরণ বলছে, সবার শেষে (২০১৯ সালে) দলে এলেও বাকি দুই সিনিয়র নেত্রীকে টেক্কা দিয়ে আপাতত লাইমলাইটের শীর্ষে পৌঁছে গেছেন অগ্নিমিত্রা পাল। গত ৯ মে রাজভবনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন মন্ত্রিসভার যে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়, সেখানে ক্রমতালিকাই স্পষ্ট করে দিয়েছে অগ্নিমিত্রার বর্তমান রাজনৈতিক ওজন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং দিলীপ ঘোষের পরেই তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন অগ্নিমিত্রা। শুধু তাই নয়, দফতর বণ্টনের পর দেখা গেছে, তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পুর ও নগরোন্নয়নের মতো অত্যন্ত ‘ওজনদার’ ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। পাশাপাশি নারী ও শিশুকল্যাণ এবং সমাজকল্যাণ দফতরের দায়িত্বও পেয়েছেন তিনি। দলের একটি বড় অংশের মতে, সাংগঠনিক পদের নিরিখে লকেটের প্রভাব বেশি হলেও, প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম সারির ক্যাবিনেট মন্ত্রী হয়ে সামগ্রিক চিত্রে অগ্নিমিত্রাই এখন সবচেয়ে শক্তিশালী ‘পদ্মদিদি’।
লকেটের বেনজির রেকর্ড বনাম নির্বাচনী ভাগ্য
সাংগঠনিক শক্তির বিচারে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থানও অত্যন্ত সুদৃঢ়। দিলীপ ঘোষের জমানা থেকে শুরু করে সুকান্ত মজুমদার এবং বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কমিটি— টানা তিনবার দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল রয়েছেন লকেট। বিজেপির ইতিহাসে কোনো মহিলার একটানা তিন মেয়াদে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার নজির কার্যত বেনজির।
তবে লকেটের তুলনায় অগ্নিমিত্রার এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘উপযুক্ত সময়ে নির্বাচনী সাফল্য’। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের নির্দেশে হুগলির সাংসদ লকেট চুঁচুড়া আসনে লড়তে গিয়ে হেরে যান। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও হুগলি আসনটি তাঁর হাতছাড়া হয়। ফলে জনপ্রতিধিত্ব থেকে সাময়িকভাবে দূরে ছিটকে যান তিনি। যদিও ২০২২ সালে উত্তরাখণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সহকারী পর্যবেক্ষক হিসেবে পাহাড়ি রাজ্যে বিজেপিকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরাতে লকেটের সাংগঠনিক ভূমিকা দিল্লির গুডবুকে তাঁর স্থান পাকা করেছিল।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের আসানসোল লোকসভা উপনির্বাচনে শত্রুঘ্ন সিনহার কাছে এবং ২০২৪ সালে মেদিনীপুর লোকসভা কেন্দ্রে দিলীপ ঘোষের জায়গায় দাঁড়িয়ে হারলেও, অগ্নিমিত্রার বিধায়ক পদ কখনো হাতছাড়া হয়নি। ২০২১ সালের পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি আসানসোল দক্ষিণ আসন থেকে তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে টানা দু’বারের বিধায়ক হয়েছেন। ফলে বিধানসভায় সবসময়ই তিনি দলের প্রধান মহিলা মুখ হিসেবে সরব থাকার সুযোগ পেয়েছেন।
‘বাধ্য ছাত্রী’ অগ্নিমিত্রা বনাম লকেটের মান-অভিমান
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের মতে, অগ্নিমিত্রার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর চরম অধ্যবসায় ও সাংগঠনিক আনুগত্য। দল যখনই তাঁকে যে নির্দেশ দিয়েছে— তা কোনো থানায় ধর্না দেওয়া হোক, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে পথ অবরোধ হোক কিংবা যেকোনো ধরনের আন্দোলন— ফলাফলের তোয়াক্কা না করে তিনি ‘বাধ্য ছাত্রী’র মতো তা পালন করেছেন।
এর বিপরীতে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক গ্রাফে মাঝেমধ্যেই ছন্দপতন দেখা গেছে। কখনো দলের অন্দরে মান-অভিমান, কখনো তাঁকে ঘিরে দলবদলের জল্পনা, আবার কখনো স্থানীয় স্তরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ক্লান্ত হয়ে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেওয়া— এই বিষয়গুলি লকেটকে প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১০ বছর পর আবার এক ফ্রেমে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়
২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মনোনীত রাজ্যসভার সাংসদ থাকলেও, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। ২০২২ সালের কলকাতা পুরভোটে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার পর তাঁর বিজেপিতে থাকা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল। লকেটের মতো দলের দুঃসময়ে সংগঠনকে আঁকড়ে ধরার দূরদর্শিতা তিনি দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ ছিল একাংশের।
তবে ২০২৬ সালের এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে ১০ বছর পর আবার রূপা গঙ্গোপাধ্যায়কে ভোটের ময়দানে নামায় বিজেপি। সোনারপুর দক্ষিণ আসন থেকে তৃণমূলের হেভিওয়েট বিধায়ক অরুন্ধতী (লাভলি) মৈত্রকে হারিয়ে জীবনের প্রথমবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়ে বিধানসভায় পা রাখছেন রূপা। এর ফলে বহু বছর পর আবার এই তিন ‘পদ্মাবতী’ একসঙ্গে স্পটলাইটে ফিরে এসেছেন।
১০ বছর আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ছিল মাত্র ৩টি। আর আজ ২০৭টি আসন নিয়ে রাজপাটে বিজেপি। এই দীর্ঘ যাত্রাপথের শেষে আপাতত এক নম্বরে থাকা অগ্নিমিত্রা পাল মন্ত্রী হিসেবে কতটা সফল হন, লকেট চট্টোপাধ্যায় সংগঠনে নিজের প্রভাব কতটা বাড়াতে পারেন, আর প্রথমবার বিধায়ক হওয়া রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের সংসদীয় পারফরম্যান্স কেমন হয়— তার ওপরেই নির্ভর করছে বঙ্গ বিজেপির এই ‘তিন দিদি’র আগামীর ক্ষমতার সমীকরণ।

