বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হলো। নিজের খাসতালুক ভবানীপুরেই পরাজিত হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ টানটান লড়াইয়ের পর বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে মুখ্যমন্ত্রীকে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নিলেন। নন্দীগ্রামের পর ভবানীপুরেও শুভেন্দুর এই জয় রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দিল।
গণনার রোমহর্ষক মোড়: যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন শুভেন্দু
সোমবার সকাল থেকেই ভবানীপুরের গণনা ছিল রোলার-কোস্টার রাইডের মতো।
- শুরুর আধিপত্য: ষষ্ঠ রাউন্ডের শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯,৩৯৩ ভোটের বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। সপ্তম রাউন্ডেও তাঁর লিড ছিল ১৭ হাজারেরও বেশি।
- শুভেন্দুর প্রত্যাবর্তন: ১২ রাউন্ডের পর থেকে ধীরে ধীরে ব্যবধান কমাতে শুরু করেন শুভেন্দু। ১২ রাউন্ডে ব্যবধান কমে দাঁড়ায় ৭,১৮৪-তে।
- চূড়ান্ত মোড়: ১৬ রাউন্ডের শেষে মমতা মাত্র ২,০০০ ভোটে এগিয়ে থাকলেও, ১৭ নম্বর রাউন্ডে পাশা উল্টে যায়। শুভেন্দু ৫৩৮ ভোটে এগিয়ে গিয়ে তৃণমূল নেত্রীকে পিছনে ফেলে দেন। এরপর ১৯ রাউন্ড শেষে তাঁর ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৮০০। গণনার একেবারে শেষ পর্যায়ে তা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
গণনাকেন্দ্রে চরম বিশৃঙ্খলা ও অভিযোগের পাহাড়
সন্ধ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
- বিজেপির অভিযোগ: শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্য নির্বাচনী এজেন্ট সূর্যনীল দাসের অভিযোগ, ১৬ রাউন্ডের পর তৃণমূল কর্মীরা গণনাকেন্দ্রে মারপিট শুরু করেন। তাঁর পাঞ্জাবি ছিঁড়ে দেওয়া হয় এবং গণনায় বাধা সৃষ্টি করা হয়।
- তৃণমূলের পাল্টা দাবি: অন্যদিকে, তৃণমূল অভিযোগ তোলে যে নির্বাচন কমিশন গণনায় কারচুপি করছে। মমতার এজেন্টদের ভিতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেন।
“১০০ আসনে গণনা লুটেছে বিজেপি”: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
গণনাকেন্দ্র ছেড়ে সন্ধ্যাবেলায় যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেরিয়ে আসছিলেন, তখন বিজেপি সমর্থকদের ‘চোর চোর’ স্লোগানে পরিস্থিতি তপ্ত হয়ে ওঠে। অত্যন্ত ক্ষুব্ধ অবস্থায় তৃণমূল নেত্রী অভিযোগ করেন, “১০০-র বেশি আসনে গণনা লুটে নিয়েছে বিজেপি।” সেখান থেকে তিনি সরাসরি কালীঘাটের বাড়িতে ফিরে যান। রাতে তাঁর বাড়িতে দেখা করতে আসেন উত্তরপাড়ায় পরাজিত প্রার্থীর পিতা তথা প্রবীণ নেতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজয়োল্লাস ও নতুন সমীকরণ
শুভেন্দু অধিকারীর জয় নিশ্চিত হতেই কলকাতার রাজপথে আবির খেলায় মেতে ওঠেন বিজেপি কর্মীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের খাসতালুকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পরাজয় তৃণমূলের জন্য এক বিশাল নৈতিক ধাক্কা। ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ (SIR) এবং প্রবল প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা— এই দুইয়ের যোগফলই কি ভবানীপুরে পদ্ম ফোটাল, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
এক নজরে ভবানীপুরের ফল:
- বিজয়ী: শুভেন্দু অধিকারী (বিজেপি)
- পরাজিত: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (তৃণমূল কংগ্রেস)
- জয়ের ব্যবধান: ১৫,১০৫ ভোট

