আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে লিফট বিভ্রাট যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। গত শনিবারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার এবং বুধবার— পর পর দু’দিন লিফট আটকে পড়ার ঘটনায় হাসপাতাল চত্বরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বারবার যান্ত্রিক গোলযোগে রোগী ও তাঁদের আত্মীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
পর পর দুই দিনের বিভ্রাট
বুধবার দুপুরে হাসপাতালের অ্যাকাডেমি ভবনের একটি লিফট আচমকা আটকে যায়। জানা গিয়েছে, লিফটটি নির্দিষ্ট তলায় পৌঁছালেও দরজা খুলছিল না। সেই সময় লিফটম্যানসহ বেশ কয়েকজন ভেতরে আটকে পড়েন। দীর্ঘক্ষণের চেষ্টায় তাঁদের নিরাপদে বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়।
এর আগে মঙ্গলবার অন্য একটি ভবনেও একই ধরনের বিপত্তি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার লিফটটি দুটি তলার মাঝখানে আটকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও আতঙ্কজনক হয়ে উঠেছিল। যদিও এই দুই ক্ষেত্রেই কোনো হতাহতের খবর মেলেনি।
শনিবারের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি
গত শনিবার ভোরে হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে লিফট দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে লিফটে উঠেছিলেন তিনি। অভিযোগ ওঠে, লিফটটি নির্দিষ্ট তলায় না থেমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেসমেন্টে চলে যায়। সেখানে দরজা খুলে অরূপবাবুর স্ত্রী ও সন্তান বেরিয়ে আসতে পারলেও, অরূপবাবু বেরোনোর আগেই লিফটটি পুনরায় উপরে উঠতে শুরু করে। লিফটের দরজা ও সিমেন্টের দেয়ালের মাঝে পিষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশ ইতিমধেই অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করেছে এবং তিন লিফটম্যানসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন ও কর্তৃপক্ষের বৈঠক
বারবার দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে বুধবার আরজি কর কর্তৃপক্ষ, বিভাগীয় প্রধান এবং জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেই বৈঠক থেকে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো হলো:
- অকেজো লিফট: হাসপাতালের মোট ৩২টি লিফটের মধ্যে বর্তমানে ১২টিই ব্যবহারের অযোগ্য।
- রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে পূর্ত দফতর (PWD) এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণকারী সংস্থা। অভিযোগ উঠেছে, রাতে কোনো টেকনিশিয়ান বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন না।
- নতুন সিদ্ধান্ত: ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা লিফট টেকনিশিয়ান রাখার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালে আরজি কর হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল দেশ। সেই ঘটনার বিচার চেয়ে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন চিকিৎসকরা। কাকতালীয়ভাবে, বুধবারই ওই নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা’কে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিধানসভা উপনির্বাচনের টিকিট দিয়েছে বিজেপি। হাসপাতালের প্রশাসনিক অব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক উত্তাপ— দুই মিলিয়েই আরজি কর এখন খবরের শিরোনামে।

