বৃহস্পতিবার রাজ্যজুড়ে পালিত হলো রামনবমীর প্রথম দিনের অনুষ্ঠান। লোকসভা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় এবারের এই ধর্মীয় উৎসবকে জনসংযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের প্রার্থীদের মিছিলে কোথাও দেখা গেল গদা, কোথাও বা তলোয়ার ও লাঠি।
ভবানীপুরে শুভেন্দুর ‘রামরাজ্য’ ডাক
রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা ভবানীপুর কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী এদিন মাথায় গেরুয়া পাগড়ি বেঁধে মিছিলে শামিল হন। মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন সাধু-সন্ন্যাসীরা। সেখান থেকেই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে শুভেন্দু বলেন:
“রামনবমীতে আমরা রামরাজ্য চাই। যেখানে নারীদের সুরক্ষা থাকবে, হাতে কাজ আর পেটে ভাত থাকবে। সনাতন বিরোধীদের বিনাশ ঘটিয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।”
ভবানীপুর থেকে সোদপুর হয়ে হেস্টিংস— দিনভর একাধিক শোভাযাত্রায় অংশ নেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর ইদ উৎসবে যোগদান নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, রামনবমীর জন্য কেন প্রশাসনের একই রকম উৎসাহ নেই।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা
গত বছরের মতো এ বছরও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে রামনবমী পালিত হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ভবনে রামের মূর্তি বসিয়ে পুজোর আয়োজন করেন পড়ুয়াদের একাংশ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানান, পুজো করার কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি কর্তৃপক্ষ দেয়নি। পুজো চলাকালীন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান এবং পাল্টা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে ক্যাম্পাস চত্বর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল।
জেলায় জেলায় অস্ত্রের আস্ফালন ও মিছিল
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় রামনবমীর মিছিলে বিজেপি প্রার্থীদের রণংদেহি মূর্তিতে দেখা গিয়েছে:
- হাওড়া: শিবপুরের বিজেপি প্রার্থী রুদ্রনীল ঘোষ এবং মধ্য হাওড়ার প্রার্থী বিপ্লব মণ্ডলকে হাতে গদা নিয়ে মিছিলে নাচতে ও স্লোগান দিতে দেখা যায়।
- বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর: ওন্দার বিজেপি প্রার্থী অমরনাথ শাখা স্টিলের লাঠি ঘুরিয়ে মিছিলে অংশ নেন। মেদিনীপুরের প্রার্থী শঙ্কর গুছাইতকেও হুড খোলা জিপে গদা হাতে প্রচার করতে দেখা গেছে।
- বীরভূম ও বর্ধমান: সিউড়িতে বিজেপি সমর্থকরা তলোয়ার নিয়ে মিছিল করেন। দুর্গাপুরের দুই বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং লক্ষ্মণ ঘোড়ুই পুলিশের বাধা উপেক্ষা করেই তলোয়ার হাতে মিছিলে হাঁটেন। তাঁদের দাবি, রাজ্যে নিরাপত্তা নেই বলেই তাঁরা ‘প্রতীকী’ অস্ত্র তুলে নিয়েছেন।
প্রশাসনের ভূমিকা ও নিরাপত্তা
হাওড়া সিটি পুলিশের কমিশনার অখিলেশ চতুর্বেদী জানিয়েছেন, শোভাযাত্রা শান্তিপূর্ণ হয়েছে। তবে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন করে ডিজে বা অস্ত্রের প্রদর্শনী হয়েছে কিনা, তা সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে নিশ্চিত করা হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দও শুক্রবারের দ্বিতীয় দফার উদ্যাপনের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বিজেপির এই ‘অস্ত্র রাজনীতি’র কড়া সমালোচনা করেছে। ওন্দার তৃণমূল প্রার্থী সুব্রত দত্তের মতে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নামে বিজেপি ভোটদাতাদের ভুল বোঝানোর চেষ্টা করছে।
উল্লেখ্য, শুক্রবারও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রামনবমীর বড় বড় শোভাযাত্রা হওয়ার কথা রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নবান্ন এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে পুলিশ।

