রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার ব্রিগেডের মেগা মঞ্চে এই মেগা শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখন সাজ সাজ রব রাজ্যজুড়ে। বিধানসভা থেকে মহাকরণ, এমনকি ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড— সর্বত্রই এখন প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তের তুঙ্গে।
বিধানসভায় পরিবর্তনের হাওয়া: খুলল পার্থর ঘরের তালা
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিধানসভায় আমূল পরিবর্তন চোখে পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলনেতার আসনে বসার পর এবার তিনি বিধানসভায় প্রবেশ করবেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে। বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ পুরনো ঘরটি নতুন করে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় চার বছর পর খোলা হলো রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘরটি। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারের পর থেকে ওই ঘরটি তালাবন্ধ ছিল। শুক্রবার সেই তালা খুলে ঘরটি পরিষ্কার করা হয় এবং প্রাক্তন মন্ত্রীর নামফলক সরিয়ে ফেলা হয়। বিধানসভা সূত্রে খবর, এই ঘরটিতেই বসবেন নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ের কর্মীরা।
ইতিমধ্যেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামফলক সরানোর কাজ শেষ হয়েছে। সোমবার থেকে বিধানসভার নির্দিষ্ট কক্ষে নিজের সরকারি কাজ শুরু করবেন শুভেন্দু অধিকারী।
নবান্ন নয়, গন্তব্য এবার মহাকরণ
বিজেপির পক্ষ থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, তাদের সরকার নবান্ন নয় বরং ঐতিহ্যবাহী মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই কাজ পরিচালনা করবে। সেই ঘোষণা মতোই মহাকরণের তিন তলায় নতুন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য কক্ষ তৈরির কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে।
২০১৩ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সচিবালয় নবান্নে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকরণই হবে আগামীর প্রশাসনিক কেন্দ্র। জানা গেছে, রাইটার্সের দোতলায় যেখানে আগে জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা বসতেন, ঠিক তার উপরের তলায় (তিন তলায়) শুভেন্দু অধিকারীর জন্য আধুনিক ভিভিআইপি ব্লক তৈরি হচ্ছে। শনিবার শপথগ্রহণের পর তিনি ‘প্রতীকী’ ভাবে সেখানে বসবেন। তবে সংস্কার কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর মূল সচিবালয় আপাতত বিধানসভা থেকেই পরিচালিত হবে।
ব্রিগেডে নজিরবিহীন নিরাপত্তা: নজরদারিতে ড্রোন
শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। হাই-প্রোফাইল এই অতিথিদের নিরাপত্তায় তিলোত্তমাকে মুড়ে ফেলা হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়।
- নিরাপত্তা বিন্যাস: পুরো ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকে ৩৫টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি ব্লকের দায়িত্বে থাকছেন একজন করে আইপিএস অফিসার। সামগ্রিক দায়িত্বে রয়েছেন কলকাতা পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ।
- কড়া বিধিনিষেধ: সভাস্থলে ছাতা, ব্যাগ বা জলের বোতল নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রত্যেক দর্শনার্থীকে কঠোর চেকিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
- আকাশপথে নজরদারি: ড্রোনের মাধ্যমে ভিভিআইপি জোন এবং সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি চালানো হবে। বহুতল ভবনগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে স্নাইপার ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
শহরে যান নিয়ন্ত্রণ
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শনিবার ভোর ৪টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কলকাতায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মালবাহী ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জরুরি পরিষেবা যেমন— দুধ, সবজি, ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার বহনকারী গাড়ি ছাড় পাবে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সংলগ্ন রাস্তা এবং হেস্টিংস ক্রসিংয়ের আশেপাশে পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এক দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর শনিবার বাংলার মসনদে বসতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে এখন মুখিয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য।

