দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী তথা আইনজীবী সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পদক্ষেপ ঘিরে বাম রাজনীতির অন্দরে নতুন করে শুরু হয়েছে আদর্শগত বিতর্ক। বুধবার বাংলা নববর্ষের সকালে বাটানগরের একটি কালী মন্দিরে সস্ত্রীক পুজো দিতে দেখা যায় এই তরুণ তুর্কিকে। আর এই ঘটনা ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে ফিরে এসেছে দুই দশক আগে প্রয়াত সুভাষ চক্রবর্তীর সেই বহুল চর্চিত তারাপীঠ দর্শনের স্মৃতি।
নববর্ষের পুজো ও সায়নের যুক্তি
কমিউনিস্ট পার্টিতে ধর্মচর্চা নিয়ে বিধিনিষেধ ও বিতর্কের ইতিহাস দীর্ঘ। সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালী মন্দিরে পুজো দেওয়াকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো বিতর্ক মাথাচাড়া দিলেও, তরুণ এই নেতা এতে কোনো ভুল দেখছেন না। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য:
“আমাদের দলের অবস্থান হলো, ধর্মীয় অনুষ্ঠান যতক্ষণ না কুসংস্কারের পর্যায়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ আমরা তাতে যুক্ত থাকতে পারি।”
তিনি আরও জানান যে, দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে অঞ্জলি দেওয়া, পাড়ার পুজোর চাঁদা তোলা বা চড়কের মেলায় থাকা তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। এগুলো দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
সুভাষ চক্রবর্তী ও ২০০৬-এর তারাপীঠ বিতর্ক
সায়নের এই পদক্ষেপ অবধারিতভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সেই ঘটনার কথা। তৎকালীন দাপুটে বাম নেতা সুভাষ চক্রবর্তী তারাপীঠ মন্দিরে পুজো দিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। সাদা পোশাকে মা তারার বিগ্রহের সামনে সুভাষের সেই ছবি দেখে অস্বস্তিতে পড়েছিল আলিমুদ্দিন। সে সময় সুভাষ বলেছিলেন, “আগে আমি হিন্দু ব্রাহ্মণ, তারপর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য।”
সুভাষ চক্রবর্তীর সেই আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। তিনি বলেছিলেন, সুভাষের মধ্যে ‘মৃত্যুভয়’ কাজ করছে। উল্লেখ্য, তার কিছুকাল আগেই সুভাষ চক্রবর্তীর ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। ২০০৯ সালে তিনি প্রয়াত হন।
রেজ্জাক মোল্লা ও ধর্মীয় বিতর্ক
সুভাষের পর সিপিএমের অন্দরে ধর্ম নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন রেজ্জাক মোল্লা। দলের রাজ্য কমিটির সদস্য থাকাকালীন তিনি হজ করতে যান এবং সমালোচনার জবাবে বলেছিলেন, “মার্ক্সের চেয়ে মহম্মদ বড়।” পরে অবশ্য শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তিনি বহিষ্কৃত হন এবং তৃণমূলে যোগ দিয়ে মন্ত্রীও হয়েছিলেন।
বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান
অতীতের সুভাষ-জ্যোতি বসু বিতর্ক প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তা সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছেন সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতে, “জ্যোতিবাবু এবং সুভাষ চক্রবর্তী দু’জনেই প্রাতঃস্মরণীয় নেতা, তাই ওই বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করা অনুচিত।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এক সময় ধর্মীয় আচরণ বামপন্থীদের জন্য ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হলেও, সায়নের মতো নতুন প্রজন্মের নেতারা ঐতিহ্যের সঙ্গে আদর্শের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করছেন। তবে দলের কট্টরপন্থী অংশ এই ‘বিচ্যুতি’কে কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

