ভোট রাজনীতির বাধ্যবাধকতা মেনে সামাজিক প্রকল্পগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংহত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করল পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার। সোমবার বিধানসভায় ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের প্রথম বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। ৮ মাসের এই বাজেটে একদিকে যেমন সড়ক, সেতু, বিমান ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিকাঠামো উন্নয়নের জোরালো দিশা দেখানো হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে বজায় রাখা হয়েছে একগুচ্ছ জনমুখী প্রকল্প।
রাজ্যের শিল্প ও বণিকমহলের একটি বড় অংশের মতে, পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকর্ষণের এই যে ইতিবাচক প্রয়াস বাজেটে দেখা গেছে, তা পূর্বতন সরকারের জমানায় কার্যত নজিরবিহীন।
কর্মসংস্থান, ডিএ ও সামাজিক সুরক্ষা
নতুন সরকারের বাজেটে সরকারি কর্মচারী এবং বেকার যুবকদের জন্য একাধিক বড় ঘোষণা করা হয়েছে:
- মহার্ঘ ভাতা (DA): রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা এক ধাক্কায় অতিরিক্ত ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
- ১ লক্ষ সরকারি চাকরি: সরকারি ও সরকার পোষিত সংস্থায় মোট ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ করা হবে, যার অর্ধেক (৫০ হাজার) পূরণ হবে শিক্ষা ক্ষেত্রে। এছাড়া পুলিশে ২০ হাজার নিয়োগ হবে।
- মহিলা সংরক্ষণ: সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
- বেকার ভাতা: আগামী অক্টোবর মাস থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ বেকার যুবকেরা প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা এবং অনূর্ধ্ব-স্নাতকেরা প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা করে ভাতা পাবেন (যাঁদের পারিবারিক মাসিক আয় ১ লক্ষ টাকার কম)।
- বিদ্যুৎ বিলে ছাড়: কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে ছাড় দেওয়া হবে, যার জন্য ৮00 কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সামাজিক প্রকল্প নিয়ে অবস্থান: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক দশক আগে সামাজিক প্রকল্পকে ‘রেউড়ি সংস্কৃতি’ বলে কটাক্ষ করলেও, পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র বা অসমের মতো বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলির পথেই হাঁটল বঙ্গ বিজেপি। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্নপূর্ণা যোজনা, বেকার ভাতা, সাংবাদিক ভাতা, পড়ুয়াদের আর্থিক সাহায্য, প্রবীণ ও বিধবা ভাতার মতো পূর্বতন সরকারের কোনও প্রকল্পই বন্ধ হবে না। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকৃত অভাবী ও দুর্বল শ্রেণির কাছে এর সুবিধা পৌঁছে দিতে স্ক্রিনিং বা ঝাড়াই-বাছাই করা হবে।
যোগাযোগের নয়া দিগন্ত: মেগা পরিকাঠামো প্রকল্প
বাজেটে সড়ক ও নদীপথে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মসৃণ করতে একাধিক বড় বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে:
- এলিভেটেড করিডর: মধ্য কলকাতা ও নিউটাউনের মধ্যে সংযোগ বাড়াতে ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭.৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উড়ালপুল বা এলিভেটেড করিডর তৈরি করা হবে।
- ডানকুনি-মগরা রোড করিডর: হুগলি জেলায় ১,৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হবে নতুন রোড করিডর। ডানকুনিকে একটি ‘মাল্টিমোডাল লজিস্টিক হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
- রেল ওভারব্রিজ: যানজট ও লেভেল ক্রসিং মুক্ত সড়ক গড়তে রেলের সহায়তায় রাজ্যের ৭০টি চিহ্নিত স্থানে রেল ওভারব্রিজ (ROB) তৈরি করবে রাজ্য।
- মেগা সেতু প্রকল্প: ভাগীরথী নদীর উপর পূর্ব বর্ধমানের কালনা ও নদিয়ার শান্তিপুরের মধ্যে ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মিত হবে। এছাড়া হলদিয়া ও নন্দীগ্রামের মধ্যে সংযোগকারী সেতুর জন্য ১০০ কোটি এবং সাগরদ্বীপের মুড়িগঙ্গা সেতুর প্রাথমিক কাজের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
- রো-রো টার্মিনাল: হাওড়া ব্রিজ ও বিদ্যাসাগর সেতুর ওপর লরি বা ভারী গাড়ির চাপ কমাতে হাওড়ার শালিমার ও কলকাতার গার্ডেনরিচের মধ্যে একটি রো-রো (Roll-on/Roll-off) টার্মিনাল তৈরি হবে, যেখানে ক্রেন ছাড়াই গাড়ি সরাসরি জাহাজে উঠতে ও নামতে পারবে।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়নে বিশেষ প্যাকেজ: আইআইটি-আইআইএম এবং মেট্রোর সমীক্ষা
বিজেপির নির্বাচনী ‘সংকল্পপত্র’ বা ইস্তাহারের প্রতিশ্রুতি মেনে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে:
- উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি (IIT) এবং একটি আইআইএম (IIM) স্থাপনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করা হয়েছে।
- উত্তরবঙ্গেই তৈরি হবে নতুন ক্যানসার হাসপাতাল। কোচবিহারের তুফানগঞ্জে তৈরি হবে একটি মহিলা কলেজ।
- কেন্দ্রীয় সরকারের ‘উড়ান’ প্রকল্পের অধীনে তিনটি নতুন বিমানবন্দরের মধ্যে দুটিই হচ্ছে উত্তরবঙ্গে— মালদহ এবং বালুরঘাটে। কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণও করা হবে।
- কলকাতার বাইরে এই প্রথম শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির মধ্যে মেট্রো পরিষেবা চালুর বিষয়ে একটি ‘টেকনো-ইকনমিক সার্ভে’ বা আর্থিক ও কারিগরি সমীক্ষা শুরু করার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গাপুর-আসানসোলেও মেট্রোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ
ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পিপিপি (PPP) মডেলে সাঁওতালডিহিতে ১,৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়া হবে। ১২টি শহরে মাটির তলা দিয়ে বিদ্যুতের কেবল নিয়ে যাওয়ার জন্য ২০০ কোটি এবং সরকারি অফিসে সোলার প্ল্যান্ট বসাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
শিল্পায়নে গতি আনতে ১০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগকারীদের স্থানীয় পঞ্চায়েত বা প্রশাসনের কাছ থেকে আর আলাদা করে লাইসেন্স বা অনুমতি নিতে হবে না। ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং শিল্পের জন্য ৫,০০০ কোটি টাকার ‘ইনসেনটিভ ফান্ড’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
“বিরোধীদের কিছু বলার সুযোগ নেই”: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
বাজেট পেশের পর অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ও অর্থ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মণকে পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি এটিকে আগস্ট থেকে মার্চ— এই ৮ মাসের বাজেট উল্লেখ করে বলেন, “এই বাজেটে কোনও ফাঁকফোকর নেই। সেবা, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি— এই পাঁচটি বিষয়ে আমরা জোর দিয়েছি। এমন কোনও অংশ নেই যা বাদ গিয়েছে। বিরোধীদেরও কিছু বলার সুযোগ নেই।” তিনি আরও জানান, প্রবীণ তৃণমূল বিধায়ক অশোক দেবও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন যে বাজেট নিয়ে সমালোচনা করার মতো কোনও জায়গা রাখা হয়নি।
“ব্যয়ের কথা আছে, আয়ের উৎস স্পষ্ট নয়”: পাল্টা তৃণমূল
বাজেট প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিধায়ক কুণাল ঘোষ মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি বলেন, “নতুন সরকারকে আমরা কিছুটা সময় দিতে চাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে ‘আত্মনির্ভর’ বাজেট করতেন, সেখানে এই বাজেট সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল। বইটিতে এতবার কেন্দ্রের উল্লেখ রয়েছে যে মনে হচ্ছিল এটা রাজ্য বাজেট নাকি কেন্দ্রীয় বাজেটের রাজ্য সংস্করণ! তাছাড়া খরচের এক গাদা খতিয়ান থাকলেও, সরকারের আয় কোথা থেকে হবে তা পুস্তিকায় স্পষ্ট নয়।” তবে পূর্বতন সরকারের চালু করা সামাজিক ভাতাগুলি এই বাজেটেও স্থান পাওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

