২২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষ সোপানে ‘ভারতসেরা’র মুকুট মাথায় তুলল ইস্টবেঙ্গল এফসি। রেফারি আদিত্য পুরকায়স্থের ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হয়ে যায় লাল-হলুদের এই ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (ISL) জয়। আর এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের রূপকার, হেড কোচ অস্কার ব্রুজো ট্রফি জয়ের মুহূর্তেও ধরে রাখলেন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা ও শান্ত আবেগ।
কোমরে হাত দিয়ে ম্যাচ শেষের প্রতীক্ষা করছিলেন অস্কার। বাঁশি বাজার পর যখন তাঁর চারপাশের সমস্ত সাপোর্ট স্টাফ ও ফুটবলাররা উল্লাসে ভাসছেন, তিনি তখন গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত সংযতভাবে প্রতিপক্ষ কোচ ও বাকিদের সাথে করমর্দন সারলেন। ম্যাচ শেষে অস্কার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, লাল-হলুদের কোচ হিসেবে এটাই তাঁর শেষ ম্যাচ এবং আগামী মরসুমে তিনি আর থাকছেন না। তবে ক্লাব কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এই চ্যাম্পিয়ন কোচকে রেখে দেওয়ার জন্য একটি জোরালো চেষ্টা চালানো হবে বলে সূত্রের খবর।
আর্সেনালের সাথে কাকতালীয় মিল ও কিশোরভারতীর উন্মাদনা
২২ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর ক্ষেত্রে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল ক্লাব আর্সেনালের সাথে এক অদ্ভুত কাকতালীয় মিল তৈরি হলো ইস্টবেঙ্গলের। কিছুদিন আগেই ঠিক ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে লন্ডনের আর্সেনাল। দুই দলই এর আগে একাধিকবার ট্রফির খুব কাছে এসেও শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হয়েছিল; ইস্টবেঙ্গল যেখানে অন্তত তিনবার আই-লিগ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া করেছিল, সেখানে আর্সেনালও গত তিন মরসনে রানার্স-আপ হয়ে সন্তুষ্ট ছিল। লন্ডনে গানার্স ভক্তদের উন্মাদনার মতোই কলকাতার কিশোরভারতী ক্রীড়াঙ্গনেও বাঁধভাঙা আবেগে ভাসলেন লাল-হলুদ সমর্থকেরা।
ম্যাচ শেষের বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই গ্যালারিতে স্লোগানের পারদ চড়ছিল। রেফারি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজাতেই বাঁধভাঙা চিৎকারে কেঁপে ওঠে গোটা স্টেডিয়াম। মাঠের মধ্যেই উল্লাসে আত্মহারা হয়ে ছোটেন অ্যান্টন সোজবার্গ, আবার আবেগে ঘাসের ওপর মুখ গুঁজে শুয়ে পড়তে দেখা যায় মিগুয়েলকে। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফুটবলার থেকে শুরু করে সমর্থকেরা।
মশাল-ধোঁয়ায় ফেন্সিং ভাঙল, মাঠ ‘ঘেরাও’ সমর্থকদের
সময়ের সাথে সাথে গ্যালারিতে একের পর এক জ্বলতে শুরু করে লাল-হলুদের প্রতীক ‘মশাল’। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্টেডিয়াম সংলগ্ন চত্বর ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। ফুটবলার ও গ্যালারির মাঝে থাকা লোহার ফেন্সিংয়ের বাধা উপেক্ষা করে কাতারে কাতারে সমর্থক মাঠে ঢুকে পড়েন।
মুহূর্তের মধ্যে ফুটবলাররা সমর্থকদের কর্ডনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার মিগুয়েলের গলায় মালা পরিয়ে তাঁকে কোলে তুলে নেন একদল সমর্থক। ভিড়ের হাত থেকে রেহাই পাননি কোচ অস্কার ব্রুজোও, তাঁকে নিয়েও সমর্থকেরা মাঠের মধ্যে নাচানাচি শুরু করেন। এছাড়া বিপিন সিং ও ইউসেফ এজ়েজারির মতো তারকাদের ঘিরেও চলে তীব্র উন্মাদনা।
প্রশাসনিকভাবে মাঠ খালি করার জন্য বারবার মাইকে ঘোষণা করা হলেও আবেগের জোয়ারে তা ভেসে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশও সমর্থকদের প্রতি কঠোর হতে চায়নি। অবশেষে ফুটবলপ্রেমীদের মাঠের এক কোণে সরিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা দড়ি দিয়ে একটি সীমানা তৈরি করেন। ভিভিআইপি বক্সের সামনের গ্যালারিতেই পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়।
‘ছিলাম, আছি, থাকব’ ট্রফি নেওয়ার পূর্বে সাউল ক্রেসপোরা বিশেষ চ্যাম্পিয়ন্স জার্সি গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামেন। যার পিঠে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘Champions’ (চ্যাম্পিয়নস) এবং সামনে জ্বলজ্বল করছিল এক আবেগঘন বার্তা— ‘ছিলাম, আছি, থাকব’।
ম্যাচ শেষ হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) সভাপতি কল্যাণ চৌবে ট্রফি নিয়ে মঞ্চে আসেন। ইস্টবেঙ্গলের অধিনায়ক মহম্মদ রশিদের হাতে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি তুলে দিতেই স্টেডিয়ামে আতশবাজি ও লাল-হলুদ আবিরের নতুন জোয়ার তৈরি হয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর অভিনন্দন বার্তা
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে লাল-হলুদ শিবিরকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সাথে তিনি রানার্স-আপ মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকেও তাদের অনবদ্য লড়াইয়ের জন্য কুর্নিশ জানান।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তায় লেখেন:
“ঐতিহাসিক জয়! ইস্টবেঙ্গল এফসি-কে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজকের এই গৌরবময় মুহূর্ত শুধু ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের নয়, সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ তথা বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী বাঙালির জন্য গর্বের। বাংলার সমৃদ্ধ ফুটবল ঐতিহ্য আজ এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে। দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং ক্লাব কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও লড়াইয়ের মানসিকতাই এই দুরন্ত সাফল্যের চাবিকাঠি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “একইসঙ্গে মোহনবাগানকেও আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। সমান পয়েন্ট নিয়ে দুর্দান্ত লড়াই করেও গোল পার্থক্যের কারণে দ্বিতীয় স্থানে শেষ করেছে তারা। সবুজ-মেরুন ব্রিগেডও বাংলার ফুটবল গৌরবকে সমানভাবে উজ্জ্বল করেছে। ফুটবল মানেই বাংলা, আর বাংলা মানেই ফুটবল। দুই প্রধান দলই আজ বাংলার সম্মান আরও বাড়িয়ে দিল।”

