রামপালের শ্ৰীবিষ্ণু – পর্ব ২

চূড়াইন বা চূড়ামণি গ্রাম বিক্রমপুরের সুপ্রসিদ্ধ সেনরাজাদের রাজধানী রামপালের অন্তর্ভুক্ত। এই গ্রামস্থ #দেউল_বাড়ি নামক স্থানে অদ্যাপি বহু ইষ্টক স্তূপ এবং ভগ্ন দেবমন্দির কঙ্কাল চিহ্ন প্রাপ্ত হয়েছে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি দেউল বাড়ি শব্দের অর্থ হল দেবালয়। এই গ্রামের ভিতর থেকে আরেকটি প্রাচীন অট্টালিকার একটি অভগ্ন কক্ষ প্রকাশিত হয়েছিল। আলোচ্য রজত নির্মিত মূর্তিটি সম্পর্কে ডক্টর ভট্টশালী মহাশয় বলেছেন তাঁর গ্রজন্থে লিখেছেন- A silver image of Vishnu, discovered in 1909 from a ditch by the Districl Board road , a little to the South of the Deul at Churain. Now in the Indian Museum, Calcutta. Exquisiteworkmanship. ১৯১৬ সালে প্রবাসী পত্রে জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রকাশিত হয় আলোচ্য বিষ্ণু মূর্তি সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ।

এই বিষ্ণুমূর্তিখানি চালিসমেত উচ্চতায় ১১ ইঞ্চি , ওজন ১১৬ তোলা।পাদপীঠের নীচে গরুড় করজোড়ে উপবিষ্ট। বেদির উপরে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্মধারী চতুর্ভুজ নারায়ণ দন্ডায়মান হয়ে সকল পৃথিবীর উত্থান ও পতন ঘটাচ্ছেন। তিনি কুলকন্ডলিনী স্বরূপ শতদল পদ্মের উপর দণ্ডায়মান। তাঁর মুখমণ্ডল সৌম্য হাস্যময় এবং অপরূপ প্রভায় বিভাসিত। তাঁর দুই পার্শ্বে লক্ষ্মী ও সরস্বতী অবস্থান করছেন। কলকাতার জাদুঘরে ললিতকলাবিভাগে রক্ষিত আছে। এই ক্ষুদ্র বিষ্ণুমূর্তিখানির শিল্পনৈপুণ্য দেখলে অবাক হতে হয়। মূর্তিটির মাথায় কিরীট , কর্ণভূষণ ইত্যাদি শিল্প নৈপুণ্যের প্রকৃষ্ট নিদর্শন।

শতবর্ষ পূর্বের প্রত্যক্ষদর্শী বলেন : রামপাল ও এতৎ নিকটবর্তী কতিপয় স্থানে মৃত্তিকার নিম্নদেশে এত ইষ্টক দৃশ্য হয় যে, তা শ্রবণ করলে চমৎকৃত হতে হয়। এমন কি তন্নিমিত্ত সহজে গমনাগমন করাও দুঃসাধ্য।

আজ হতে শতবৎসর পূর্বে পূর্বোক্ত রাজবাটির সন্নিহিত বহু ভদ্রলোক- সমকীর্ণ বজ্রযোগিনী নামক গ্রামে, ভগবান রায় নামক জনৈক সৎকুলোদ্ভব মহাশয় স্বীয় বাটির এক স্থানে একটি পুষ্করিণী ও একটি গর্ত খনন করে তাতে এত ইষ্টক প্রাপ্ত হয়েছিলেন যে , ওই ব্যক্তি আপন গৃহে একতলা, দোতলা , পাঁচ ছয়টি দালান ,ঘাটলা ইত্যাদি নির্মাণ করতে আর ইঁট ক্রয় করতে হয় নি। শ্রুতি তিনি আটলক্ষ ইঁট পেয়েছিলেন। সে সকল ইঁটের দৈর্ঘ্য ছিল কম পক্ষে দেড় হাত ও বিস্তার প্রায় আঠার অঙ্গুলি। এইরূপ অনেকেই মাটির নীচে অসংখ্য ইঁট পেয়েছেন। সেগুলি সবই এক, দেড়, আড়াই, তিন , সাড়ে তিন বা পাঁচ হাত মাটির নিম্নে প্রাপ্ত হয়েছে। অনেকেই প্রস্তর , ধাতু, যৌগিক পদার্থ নির্মিত অদ্ভুত মূর্তি সকল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তবে অনেকেই সেসবের নাম বা পরিচয় সম্পর্কে অবগত না হওয়ার কারণেই সেসবের অনেকটাই সংরক্ষন হয় নি। অবহেলায় নষ্ট হয়েছে ইতিহাস , ধর্ম ও ঐতিহ্য।

এমনও কথিত আছে যে রামপালে যেসব প্রাচীন ইষ্টকাদি প্রাপ্ত হয়েছিল তা দ্বারা ঢাকা নগরীর বহু ভবনাদি নির্মাণ হয়। বিক্রমপুর যে প্রাচীনকালে মহা সমৃদ্ধশালী স্থান ছিল তা দিন দিন প্রকাশিত হয়ে নানা মেকি ইতিহাসবক্তাদের বার বার চমকিত এবং বিস্মিত করেছে। বিক্রমপুরের প্রায় সকল গ্রাম থেকেই এইরূপ নব নব আবিষ্কারের পরিচয় প্রাপ্ত হয়। কামারখাড়া নামক গ্রামেও বেশ কিছু বৎসর পূর্বে একটি অষ্টধাতুর নির্মিত বিষ্ণুমূর্তি প্রাপ্ত হয়। সেই মূর্তিরও কারুকার্য ছিল অসাধারণ।

চূড়াইন গ্রামে প্রাপ্ত রজত বিষ্ণুমূর্তিটি পূর্বে সরকারের অধীনে ঢাকার কালেক্টরিতে রক্ষিত ছিল। সেটিকে পাওয়ার জন্য উক্ত গ্রামের হিন্দুরা সরকারের নিকট আবেদন নিবেদন করলেও বিফল মনোরথ হন। সে সময় তাঁদের বলা হয় যে ঐ মূর্তি লন্ডনের কেন্সিঙ্গটন নামক জাদুঘরে রক্ষার জন্য প্রেরিত হবে।

অরূপ এই বিষ্ণুমূর্তিটি যিনিই দর্শন করেন তিনিই বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়েন। দেবমূর্তির লোচনান্দদায়ক শিল্প নৈপুণ্য দেখে প্রাচীন ভারতের শিল্পের অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্য অনুভব করে আনন্দিত এবং গর্বিত হওয়ার সঙ্গে বর্তমান অবনতির দিকে লক্ষ্য করে দুঃখে ম্রিয়মাণ হতে হয়।

এশিয়াটিক সোসাইটি নিকট যখন মূর্তিটি প্রেরিত হয় , তাঁরা বিগ্রহটিকে দক্ষিণাত্য শিল্প বলে উল্লেখ করেন।

বিক্রমপুরের বহু গ্রামেই বৌদ্ধ ও হিন্দু দেবদেবী মূর্তি অনেক অনেক আবিষ্কার হয়েছে। একসময় সংস্কৃত চর্চা এবং জ্যোতিষ আলোচনার জন্য বিক্রমপুর বিখ্যাত ছিল। এই বিক্রমপুর রামপাল শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের আলোকে আলোকিত হয়েছিল। প্রথম পঞ্জিকা প্রস্তুত এই বিক্রমপুরের বুকেই হয়। এরপর পঞ্জিকা নির্মাণের কাজ শুরু করে নবদ্বীপ। বিক্রমপুরের স্থানীয় সময় উজ্জয়নী হতে এর দেশান্তর দুই দণ্ড চৌত্রিশ পল ঠিকভাবে গণনা করে পঞ্জিকায় দেওয়া হত। নবদ্বীপে যখন পঞ্জিকা প্রস্তুত হতে শুরু করে তখন বিক্রমপুরের স্থানীয় সময়ই দেওয়া হয়। পরে কলকাতা পঞ্জিকা নির্মাণের সময় এই একই নিয়ম পালন করত।

আধুনিক কালের দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, বিচারপতি চন্দ্রমাধব ঘোষ, বিজ্ঞানাচার্য স্যার জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখ অখন্ড ভারতের খ্যাতিমান পুরুষের জন্মস্থান বিক্রমপুর। এই অঞ্চলের পাতক্ষীর, দই, সন্দেশ ও নারিকেল জিবা- চিঁড়ার খ্যাতি ভুবন জোড়া। রামপাল আজও সনাতনী ভারতের প্রাচীন চিহ্ন বহন করে চলেছে।

বিক্রমপুরে চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্ৰীচন্দ্রদেবের তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়েছে। খড়্গ বংশের পতনের পর চন্দ্রবংশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। শ্ৰী চন্দ্রদেবের রাজধানী ছিল রাজধানী বিক্রমপুর। তাঁর মাতার নাম ছিল কাঞ্চনা। এত তাম্রশাসন দ্বারা শ্ৰীচন্দ্রদেব পৌন্ড্রবর্ধনভুক্তির নেহকাষ্ঠী গ্রামে পীতবাস গুপ্তশর্মাকে শাক্যসিংহের উদ্দেশ্যে কিছু ভূমি প্রদান করেছিলেন।

শ্ৰী ধনঞ্জয় দাসমজুমদারের রচনায় প্রাপ্ত হয় , বিক্রমপুর , চন্দ্রপ্রতাপ, বরিশাল নিয়ে গঠিত রাজ্যটি দেব বংশের রাজাদের তাম্রলিপিতে #বিক্রমপুরনাব্য_রাজ্য নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন রামপাল। তাঁর পূর্বপুরুষ ভারত সম্রাট #বীরবিক্রম বা সম্রাট ধর্মপালের নামে স্থাপন করেন বিক্রমপুর রাজ্য এবং রাজধানীর নাম দেন রামপাল। রামপাল তাঁর মাতৃস্বসা , পুত্র , ভূষণার স্বাধীন রাজা হরিবর্মার বৈমাত্রেয় ভাই শ্যামল বর্মাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শ্যামল বর্মাই সম্রাট রামপালের প্রতিষ্ঠিত নাব্য রাজ্যে প্রথম সন্ধিবদ্ধ স্বাধীন রাজা ও বঙ্গের প্রতিরাজ রূপে রাজত্ব করেন এবং তাঁরই বংশধর মন্দা রায় বা মুকুট রায় এই রাজ্যের স্বাধীন রাজা রূপে ১৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভূঁইয়া নাম ধারণ করেছিলেন।

সুতরাং শ্যামল বর্মার বংশধরগণ দেব ও রায় উপাধি গ্রহণ করলেও একমাত্র তাঁরাই ধারাবাহিকভাবে বিক্রমপুর রাজ্যে রাজত্ব করে গিয়েছিলেন । শ্যামল বর্মা রামপালের নিকট হতে রাজ্য পেয়েছিলেন ১০৮৪ খ্রিস্টাব্দে । শ্যামল বর্মার পর তার পুত্র ভোজ বর্মা রাজা হন। এই বংশেরই উত্তরপুরুষ দশরথদেব দনুজমাধব। তাঁর পুত্র রামচন্দ্র চন্দ্রদ্বীপ শাসন করেছিলেন। বিক্রমপুরে রাজা শ্যামল বর্মার রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। তাছাড়া শ্যামল বর্মা ও ভোজ বর্মার বহু তাম্রলিপি ও শিলালিপিও পাওয়া গেছে। সোনারগাঁয়েও তাঁদের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যতীন্দ্রমোহন রায়ের ” ঢাকার ইতিহাসে” আছে, রাজপ্রাসাদের সামনে পরিখার উপর ছিল চলন্ত সেতু। এখানে যে বন্দর ছিল, সেই বন্দর থেকে ইবন বতুতা যবদ্বীপ যাত্রা করেছিলেন। দশরথদেব দনুজমাধবের বংশধর রাজা মন্দা রায় ওরফে মন্দ্রি রায় বা মুকুট রায় বিক্রমপুরের রাজা ছিলেন । তিনি ছিলেন অন্যতম বারোভূঁইয়া।

বিক্রমপুর বিস্তীর্ণ স্থান। এ অঞ্চলের প্রাচীন সময়ের উন্নতির বিষয় বিষয় চিন্তা করলে বর্তমানে যারপরনাই ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। প্রাচীনকালে বিক্রমপুরের ন্যায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ স্থান অল্পই দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু কি পরিতাপের বিষয়? আজ খন্ডিত হয়ে যাওয়া ভারতে অখণ্ড ভারতের স্থানগুলির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হলে অনেকেই এসে তা নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেন। কিছু মানুষ মনে করে বঙ্গের ইতিহাস নাকি শুরু হয়েছিল মাত্র মরু আক্রমণের পরে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা আমাদের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে চর্চা করি নাই। কেবল তাই নয় , আমরা আমাদের ইতিহাসকে ভুলে যেতে চাই। যে জাতি ইতিহাস ভুলে যায় তাকে ইতিহাসও ক্ষমা করে না।

সমাপ্ত

তথ্যঃ ১ .বিক্রমপুর -রামপালের ইতিহাস
২.পুরান ঢাকা
৩. বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস রজনীকাণ্ড

@দুর্গেশনন্দিনী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.