উত্তর-পূর্ব্ব ভারতের বরাক উপত্যকায়(Barak Valley) প্রাণের বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিলো আসাম সরকারের ‘অসমীয়া ভাষা’কে রাজ্যের একমাত্র সরকারী দাপ্তরিক ভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, যদিও জনসংখ্যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল বাংলাভাষী । বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষী জনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠ, বিশেষতঃ বাঙালি সিলেটি ।

১৯৬০ সালের ২১ ও ২২শে এপ্রিল, ‘আসাম প্রদেশ কংগ্রেস’ তাদের কমিটিতে অসমীয়া ভাষাকে আসাম প্রদেশের একমাত্র দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করে, এতে বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে । আসামের তৎকালীণ মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বলেন, ‘দাবিটা রাজ্যের অনসমীয়াদের নিকট থেকে আসুক’। কিন্তু মাস দুয়েক যেতে না যেতেই বিধান সভায় তিনি ঘোষণা করেন ‘অহমীয়াকে রাজ্যভাষা করার জন্য সরকার শিগগিরই একটি বিল আনছেন’। স্থানীয় অসমীয়ারা উত্তেজিত জনতা; বাঙালি অভিবাসীদের আক্রমণ করে । ততক্ষণে উগ্র জাতীয়তাবাদীদের তান্ডব গুয়াহাটি গোরেশ্বরে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকহারে । রাজ্যভাষা করার নামে সাম্প্রদায়িক আন্দোলন গড়ায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় । ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় নরমেধ যজ্ঞ শুরু হলো । জুলাই ও সেপ্টেম্বরে সহিংসতার মাত্রা উচ্চরূপ নেয় যখন প্রায় ৫০,০০০ বাঙালি হিন্দু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরবঙ্গে পালিয়ে যায় । অন্য ৯০,০০০ নিকটবর্তী বরাক উপত্যকা ও উত্তর-পূর্ব্ব ভারতের নর্থ ত্রিপুরাসহ অন্যত্র পালিয়ে যায় । রাজ্যের রক্ষক ঈশান বাংলার পুলিশ পক্ষপাতমূলক আচরণ শুরু করলো । স্থানে স্থানে দাঙ্গাকারী আর পুলিশ এক হয়ে আক্রমণ চালালো । তাঁদের বর্বরতা পশুর হিংস্রতাকেও ছাড়িয়ে গেল ।

২রা জুলাই ১৯৬০, কাছার জিলার শিলচরে ডাকা হয় “নিখিল আসাম বাঙলা ও অন্যান্য অনসমীয়া ভাষা সম্মেলন”। প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিল লুসাই-খাসিয়া-গারো-মণিপুরী-বাঙালি সবাই । সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গৃহীত হয় ‘ভাষা প্রশ্নে স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে ।’ কেন্দ্রের কাছে প্রার্থনা জানানো হলো ‘ভাষার প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করুন’। ১৯৬০ সালের ১৫ই আগস্ট, কলিকাতা শোক দিবস পালন করল । উগ্রজাতীয়তাবাদী বর্বরতার প্রতিবাদে সরকারি-বেসরকারি সমস্ত অনুষ্ঠান বর্জন করা হল । পরবর্তী লোকসভা অধিবেশনে আলোড়ন উঠল, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল । প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু শান্তির দূত পাঠালেন গোবিন্দবল্লভ পন্থকে, পন্থজী ফর্মুলা দিলেন । ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা নির্দ্বিধায় তা নাকচ করে প্রত্যাখ্যান করল । ঈশান বাংলার প্রতিনিধিরা ছুটলেন দিল্লী, কিন্তু দিল্লী নির্বিকার । অসম সরকার দায়সারাভাবে ‘গোপাল মেহরোত্রা’র নেতৃত্বে এক ব্যক্তির একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে । কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধুমাত্র কামরূপ জিলার ২৫টি গ্রামের ৪,০১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণ করা হয়; সেই জেলা ছিল সহিংসতার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত এলাকা । নয়জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং একশ’র বেশি আহত হয় ।
১০ই অক্টোবর ১৯৬০, সেই সময়ের অসমের তৎকালীণ মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চলিহা ‘অসমীয়া’কে আসামের একমাত্র সরকারী দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেন । উত্তর করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিধায়ক শ্রী রণেন্দ্র মোহন দাস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এই বলে যে, “বরাক উপত্যকার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষার ওপর এক-তৃতীয়াংশ মানুষের ভাষাকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হবে । অধিকন্তু এটি ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপন্থী হবে । সেই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, কোন রাজ্যের জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন যদি একটি মাত্র ভাষায় কথা বলে, কেবলমাত্র তাহলেই ঐ ভাষা একক সরকারি ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে”। শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও পাথরকান্দিতে বসবাসকারীদের ৮০ শতাংশই ছিল বাঙালি । কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে রণেন্দ্র মোহনের বিরোধিতায়ও কোন কাজ হয় নি । অধিকন্তু ২৪শে অক্টোবর প্রস্তাবটি বিধানসভায় গৃহীত হয়, সমগ্র আসামে সরকারি ভাষা হলো ‘অহমীয়া’ । শুধু কাছাড়ের জন্য জেলান্তরে রইলো ‘বাংলা ভাষা’ ।

১৯৬১ সালের ১৫ই জানুয়ারী ‘শীলভদ্র যাজী’কে সভাপতি করে করিমগঞ্জে সম্মেলন ডাকা হলো । শিলচর সম্মেলনের প্রস্তাব নতুন করে ঘোষণা করা হলো । সমগ্র কাছাড় জেলায় বিক্ষোভ দানা বেঁধে উঠল ।
ভাষার প্রশ্নে সমগ্র কাছাড় ‘এক মন এক প্রাণ’ হয়ে শপথ নিল ‘জীবন দেবো তবু ভাষা দেবো না’, ‘মাতৃভাষার মর্যাদা যে কোন মূল্যে রক্ষা করবোই’।

বরাক উপত্যকার বাঙালীদের উপরে ‘অসমীয়া ভাষা’ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ১৯৬১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারী করিমগঞ্জের রমণীমোহন ইনস্টিটিউটে “কাছাড় গণ সংগ্রাম পরিষদ” নামক সংগঠনটির জন্ম হয় । অসম সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ই এপ্রিল তারিখে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির লোকেরা সংকল্প দিবস পালন করেন । বরাকের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই পরিষদ ২৪শে এপ্রিল একপক্ষ দীর্ঘ একটি পদযাত্রা শুরু করেছিল । ২রা মে শেষ হওয়া এই পদযাত্রাটিতে অংশ নেওয়া সত্যাগ্রহীরা প্রায় ২০০ মাইল উপত্যকাটির গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালিয়েছিলেন । পরিষদের মুখ্যাধিকারী শ্রী রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেছিলেন যে, যদি ১৩ই এপ্রিল ১৯৬১ তারিখের মধ্যে বাংলাকে সরকারী ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, তবে ১৯শে মে তাঁরা ব্যাপক হরতাল পালন করবেন ।
১২ই মে প্যারামিলিটারী The Assam Rifles – Sentinels of the North East, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী Central Reserve Police Force CRPF কাছারের শিলচরে ফ্ল্যাগমার্চ করে । ১৮ই মে অসম পুলিশ ভাষা আন্দোলনের তিনজন নেতা সর্বশ্রী নলিণীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভুষণ চৌধুরী(সম্পাদক, সাপ্তাহিক যুগশক্তি)কে গ্রেপ্তার করে ।

১৯শে মে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল ও পিকেটিং আরম্ভ হয় । করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারী কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট-কাছারী ইত্যাদিতে পিকেটিং করেছিলেন । শিলচরেও তাঁরা Silchar Railway Station তারাপুরে(অধুনা, ভাষা শহিদ স্টেশন) হরতাল পিকেটিং করেছিলেন । শিলচর স্টেশনে বিকেল ৪ ঘটিকার সময়সূচির ট্রেনটির সময় পার হওয়ার পর হরতাল শেষ করার কথা ছিল । ভোর ৫:৪০ এর ট্রেনটির একটিও টিকিট বিক্রি হয় নি । সকালে হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হয়েছিল, কিন্তু বিকেলে রেলওয়ে স্টেশনে অসম রাইফেল এসে উপস্থিত হয় । মধ্যাহ্নের প্রায় ০২ঃ৩০র সময় ন’জন সত্যাগ্রহীকে কাটিগোরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের একটি ট্রাক তারাপুর স্টেশনের কাছ থেকে পার হয়ে যাচ্ছিল । পিকেটিংকারী সকলে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যেতে দেখে তীব্র প্রতিবাদ করে । ভয় পেয়ে পুলিশরা বন্দীদের নিয়ে পালিয়ে যায় । এর পর কোনো অজ্ঞাত অসনাক্ত লোক পুলিশ ট্রাকটি জ্বালিয়ে দেয়, যদিও দমকল বাহিনী এসে তৎপরতার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে । তারপর প্রায় ০২ঃ৩৫ নাগাদ স্টেশনের সুরক্ষায় থাকা প্যারামিলিটারী বাহিনী আন্দোলনকারীদেরকে বন্দুক ও লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করে । এরপর সাত মিনিটের ভিতর তাঁরা ১৭ রাউণ্ড গুলি আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চালায় । সেদিন ১২ জন বাংলা ভাষাপ্রেমী লোকের দেহে গুলি লেগেছিল । তাঁদের মধ্যে ন’জন সেদিনই নিহত হয়েছিল । দু’জন পরে মারা যান । স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে শিলচর শহরে । রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় শিলচর রেলওয়ে স্টেশন ও আশেপাশের এলাকা এবং শোকে স্তব্ধ ও হতবাক হয়ে যান বরাক উপত্যকার বাঙালিরা । সমগ্র বরাক উপত্যকায় শোকের ছায়া নেমে আসে ।

২০শে মে শোকার্ত আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে শহীদদের লাশ নিয়ে শিলচর শহরে স্মরণকালের বৃহত্তম শোকমিছিল বের করে । এই ঘটনার পর অসম সরকার বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারী দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয় ।

মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ১১ জন শহিদ হন, তারা হলেন-
???? কমলা ভট্টাচার্য(পৃথিবীর একমাত্র নারী ভাষা শহিদ)
???? শচীন্দ্র পাল
???? বীরেন্দ্র সূত্রধর
???? কানাইলাল নিয়োগী
???? চন্ডিচরণ সূত্রধর
???? সত্যেন্দ্র দেব
???? হীতেশ বিশ্বাস
???? কুমুদরঞ্জন দাস
???? তারিণী দেবনাথ
???? সুনীল সরকার, এবং
???? সুকুমার পুরকায়স্থ ।
আসাম রাজ্য সরকার আন্দোলনকারীদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিল বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসেবে ঘোষণা দিতে ।।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.