প্রথাগত রাজনৈতিক স্লোগান, ঝাণ্ডা আর চেনা চোয়ালচাপা কাঠিন্য নয়; গান, আড্ডা, সেলফি আর হুল্লোড়ের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ জানাল নতুন প্রজন্ম। দিল্লিতে নিট (NEET) পরীক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ এবং এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়মের প্রতিবাদে শুক্রবার বিকেলে কলকাতার ডোরিনা ক্রসিংয়ে জড়ো হয়েছিল হাজারো ‘জেন-জি’ (Gen-Z) শিক্ষার্থী। সমাজমাধ্যমে সাড়া ফেলে দেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র ডাকে রাজপথে নেমে এই তরুণ সমাজ বদলে দিল কলকাতার চেনা আন্দোলনের রূপরেখা।
প্রথা ভাঙা প্রতিবাদ ও বেপরোয়া মেজাজ
শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ শিয়ালদহ থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিংয়ে পৌঁছে কার্যত এক মেলার আকার ধারণ করে। মিছিলের সিংহভাগ অংশজুড়ে ছিল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং নিট পরীক্ষার্থীরা। যাদের একটি বড় অংশ রাজনীতি থেকে বহুদূরে। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, খালসা স্কুল থেকে শুরু করে কলকাতার স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সদ্য প্রাক্তনীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রতিবাদকারীদের হাতে ছিল বৈচিত্র্যময় সব পোস্টার। রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে তাতে লেখা ছিল প্রথাভাঙা বক্তব্য— যেমন “এরর ৪০৪, অ্যাকাউন্টিবিলিটি নট ফাউন্ড” কিংবা পপ-কালচার ও ব্যঙ্গের মিশ্রণে তৈরি নানা বার্তা। অনেকের মুখে ছিল সার্জিক্যাল মাস্ক, আবার কেউ কেউ ব্যাটম্যান, সুপারম্যান কিংবা হাল্কের মুখোশ পরে ‘সুপারহিরো’ সেজে প্রতিবাদে অংশ নেন।
সমাজমাধ্যমের বার্তা থেকে রাজপথের দখল
কলকাতায় এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি সমাজমাধ্যম পেজ, যার অনুগামী সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। এই কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদন করেছিলেন দেদীপ্য গঙ্গোপাধ্যায় নামে ২৫ বছর বয়সী এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র (যিনি শৈশবে ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন)। দেদীপ্য জানান, মাত্র সাত দিনের প্রস্তুতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এত তরুণ-তরুণী রাজপথে নেমে আসবে, তা তাঁদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল। দিল্লি বা মুম্বইয়ের সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও ইনস্টাগ্রাম পেজের মাধ্যমেই কলকাতায় এই স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত সম্ভব হয়েছে।
সাময়িক বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনা
প্রতিবাদের চেনা ধরন আনন্দ-আড্ডার হলেও বিকালের দিকে ডোরিনা ক্রসিং চত্বরে কিছুটা উত্তেজনা ছড়ায়। ভিড়ের মধ্যে ‘বিজেপির দালাল’ সন্দেহে এক ব্যক্তিকে ঘিরে জুতোর সঙ্গে জলের বোতল ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং জলের বোতল উড়ে আসে পুলিশের দিকেও। পরে পুলিশকে পরিস্থিতি সামাল দিতে পদক্ষেপ করতে হয়।
আন্দোলনের সংগঠক দেদীপ্য এবং উপস্থিত বাম ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের দাবি, এই বিশৃঙ্খলার পেছনে আন্দোলনকারীদের কোনো হাত ছিল না; কিছু বহিরাগতই এই অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করার চেষ্টা করেছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে নিজেদের ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশের যে ধরণ তরুণ প্রজন্ম তুলে ধরল, তা কলকাতার প্রতিবাদী ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক নতুন সংযোজন।

