ঐতিহ্যের সম্মান: দিঘার জগন্নাথ মন্দির আর ‘ধাম’ নয়, ওড়িশার প্রস্তাবে নাম বদল করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

ঐতিহ্যের সম্মান: দিঘার জগন্নাথ মন্দির আর ‘ধাম’ নয়, ওড়িশার প্রস্তাবে নাম বদল করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী

দীর্ঘদিনের বিতর্কে ইতি টেনে দিঘার জগন্নাথ মন্দির থেকে অবশেষে বাদ পড়ল ‘ধাম’ শব্দবন্ধটি। মঙ্গলবার এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির বিশেষ অনুরোধ ও প্রস্তাব মেনে নিয়েছে রাজ্য সরকার। এখন থেকে দিঘার এই সমগ্র মন্দির কমপ্লেক্সের নতুন নাম হবে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ এবং মূল মন্দিরটি পরিচিত হবে ‘শ্রী জগন্নাথ দেব মন্দির’ নামে।

ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি নিয়ে দূত হিসেবে এ দিন কলকাতায় এসেছিলেন পুরীর বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্র। তাঁর সঙ্গে বৈঠকের পরেই এই সিদ্ধান্তের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী।

সনাতন সংস্কৃতির অবমাননা দূর করার প্রয়াস

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, দিঘার এই প্রকল্প নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক ছিল। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট করেছেন যে, মন্দিরে পুজোপাঠ নিয়ে কারও কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ‘ধাম’ শব্দটির ব্যবহার সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন:

“আগের সরকার মন্দিরের নামের সাথে ‘ধাম’ লিখে সনাতন সংস্কৃতির যে অপমান করেছিল, এই সরকার তা করবে না। সরকারি নথিপত্র এবং হিডকোর (HIDCO) টেন্ডারেও এটিকে ‘কালচারাল সেন্টার’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছিল। মন্ত্রিসভার অনুমোদন মেনে পুরো কমপ্লেক্সের নাম ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ করা হচ্ছে এবং যেখানে বিগ্রহ থাকবে তা ‘শ্রী জগন্নাথ দেব মন্দির’ নামে পরিচিত হবে।”

তিনি আরও জানান, শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনেই এই মন্দিরে জগন্নাথ দেবের পুজো হবে। মন্দির চত্বরে সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক পরিবেশ বজায় থাকবে, প্রসাদের ব্যবস্থা করা হবে এবং দ্রুত একটি পরিচালন ট্রাস্ট কমিটি গঠন করে বিস্তারিত তথ্য ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে।

আদি শঙ্করচার্যের ৪ ধাম এবং ‘ধাম’ বিতর্কের নেপথ্যে

পুরীর সাংসদ সম্বিত পাত্র ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানান। কেন ‘ধাম’ শব্দ নিয়ে আপত্তি, তার ব্যাখ্যা দিয়ে সম্বিত বলেন:

  • সনাতন পরম্পরা: সনাতন ধর্ম অনুসারে ভারতে মাত্র চারটিই ‘ধাম’ রয়েছে, যার অন্যতম ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ ধাম। আদি শঙ্করাচার্য এই চার ধাম স্থাপন করেছিলেন।
  • আবেগে আঘাত: ২০২৫ সালের এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের তত্‍কালীন তৃণমূল সরকার দিঘার এই মন্দির উদ্বোধন করে একে ‘জগন্নাথ ধাম’ নাম দেয়। এর ফলে সাড়ে চার কোটি ওড়িয়া মানুষের পাশাপাশি বাংলার জগন্নাথ ভক্তদের মনেও আঘাত লেগেছিল।

ভাষাতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ‘ধাম’ শব্দের অর্থ তীর্থস্থান হতে গেলে সেখানে ঈশ্বর বা মহাপুরুষের লীলাক্ষেত্র হওয়া আবশ্যক। সেই সংজ্ঞায় দিঘার নতুন মন্দিরকে ‘ধাম’ বলা চলে না।

সিদ্ধান্তের স্বাগত জানাল ইস্কন ও প্রধান পুরোহিত

দিঘার জগন্নাথ মন্দিরের পুজো ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ইস্কন (ISKCON)। মন্দিরের ট্রাস্টি তথা প্রধান পুরোহিত রাধারমণ দাস রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন।

সম্প্রতি মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে তাঁর এই নাম পরিবর্তন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা হয়েছিল বলে তিনি জানান। রাধারমণ দাস বলেন, “আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে এখন থেকে এটি ‘দিঘা জগন্নাথ মন্দির’ নামে পরিচিত হবে।”

বিগ্রহের কাঠ চুরি ও পুরীর সেবায়েত বিতর্ক

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে এই মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটনের সময় থেকেই ওড়িশার সাথে পশ্চিমবঙ্গের পারদ চড়ছিল। দিঘার মন্দিরের বিগ্রহ তৈরিতে ২০১৫ সালের পুরীর মন্দিরের ‘নবকলেবর’-এর পবিত্র নিমকাঠের অবশিষ্টাংশ অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছিল।

এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ওড়িশা সরকার পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েত রাজেশ দয়িতাপতিকে শো-কজ (Show Cause) করে এবং একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ দেয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা কটাক্ষ সেই সময় এই বিতর্কের জবাবে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওড়িশা সরকারকে তোপ দেগেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “জগন্নাথধাম তৈরি করাটা ওদের গায়ে লেগেছে। ওরা বলছে আমি নাকি নিমগাছ চুরি করেছি! আমার নিজের বাড়িতেই চারটে নিমগাছ আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত খারাপ সময় আসেনি যে নিমগাছ চুরি করতে হবে।”

তবে অতীতের সমস্ত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় তরজায় সিলমোহর দিয়ে বর্তমান রাজ্য সরকার স্পষ্ট করে দিল, আন্তর্জাতিক স্তরে পুরীর জগন্নাথ ধামের একক ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই দিঘার মন্দিরের নাম সংশোধন করা হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.