কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশন কক্ষ বন্ধ থাকাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার চরম উত্তেজনা ছড়াল পুর-রাজনীতিতে। অধিবেশন কক্ষে ঢুকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত বাইরেই বৈঠক সারেন তৃণমূল কাউন্সিলরেরা। এই নজিরবিহীন ঘটনার জল গড়ায় থানা পর্যন্ত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের কাউন্সিলরদের মনোবল চাঙ্গা করতে এবং পরবর্তী রণকৌশল নির্ধারণে শুক্রবার সন্ধ্যায় কালীঘাটে জরুরি বৈঠকে বসেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর, যেকোনো পরিস্থিতিতেই কাউন্সিলরদের পদত্যাগ না করার এবং রাস্তায় নেমে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি।
ঘরে তালা, অলিন্দেই বসল পুর-অধিবেশন
শুক্রবার কলকাতা পুরসভার পূর্বনির্ধারিত মাসিক অধিবেশন ঘিরে নজিরবিহীন জটিলতা তৈরি হয়। অভিযোগ, পুরসভার অধিবেশন কক্ষটি তালাবন্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশই করতে পারেননি শাসকদলের কাউন্সিলরেরা। পুরসভার চেয়ারপার্সন তথা তৃণমূল সাংসদ মালা রায় নিজে ঘরটি খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলেও চাবি মেলেনি। নবনিযুক্ত সেক্রেটারি জানান, তিনি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ না করায় চাবি দিতে পারবেন না।
এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে অধিবেশন কক্ষের বাইরে কাউন্সিলর’স ক্লাব রুমেই বিকল্প সভা পরিচালনা করেন মালা রায়। মাইক এবং পর্যাপ্ত আসনবিন্যাস ছাড়াই চলে অধিবেশন। সেখানে বক্তব্য রাখেন ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ এবং মেয়র ফিরহাদ হাকিম।
ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন:
“হাউস খোলা বা বন্ধ করার একচ্ছত্র অধিকার চেয়ারপার্সনের। আজ যা ঘটেছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপমানের। নির্বাচিত সদস্যদের কাজ করতে না দিলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। বর্ষায় জল জমলে বা কোনো বিপর্যয় হলে তার দায় কে নেবে?”
চেয়ারপার্সন মালা রায় এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নিউ মার্কেট থানার দ্বারস্থ হয়েছেন এবং কার নির্দেশে কক্ষ বন্ধ রাখা হয়েছিল, তা জানতে চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। তাঁর কথায়, “নির্বাচিত পুর বোর্ডের অধিবেশনে কক্ষ বন্ধ রাখার এমন ঘটনা ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি।”
কালীঘাটের বৈঠক: নতিস্বীকার নয়, জনসংযোগে জোর মমতার
কলকাতা পুরসভার ঘটনাপ্রবাহের পরই সন্ধ্যায় কালীঘাটে পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠকে বসেন মুখ্যমন্ত্রী তথা দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সূত্রে খবর, বৈঠকে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, কোনো রকম চাপের মুখে মাথা নত করা চলবে না এবং কেউ চাপ দিলেও পদত্যাগ করা যাবে না।
বৈঠকের প্রধান নির্দেশনাসমূহ:
- সাংবিধানিক মেয়াদ সুরক্ষা: কাউন্সিলরেরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁদের সাংবিধানিক মেয়াদ রয়েছে। এই সময়সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরসভার কাজ স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
- পরিষেবা অক্ষুণ্ণ রাখা: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কলকাতার নাগরিকেরা যাতে কোনোভাবেই পুর-পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে কাউন্সিলরদের অত্যন্ত সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- জনসংযোগ বৃদ্ধি: সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ আরও নিবিড় করার বার্তা দিয়েছেন নেত্রী।
‘ধর্মঘট’ নয় ‘ধর্না’, রাস্তায় নামার প্রস্তুতি শাসকদলের
আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করছে তৃণমূল। সূত্রের খবর, বৈঠকে আগামী দিনে ধর্না কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আলোচনা চলাকালীন অসাবধানতাবশত ‘ধর্না’র বদলে তিনি ‘ধর্মঘট’ শব্দটি উচ্চারণ করায় উপস্থিত নেতৃত্বের মধ্যে সাময়িক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কারণ, গত ১৫ বছরের শাসনকালে ধর্মঘটের রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন তিনি। তবে দ্রুত ভুল সংশোধন করে নেত্রী স্পষ্ট করেন, তিনি ধর্মঘট নয়, ‘ধর্না’র কথাই বলছেন।
আন্দোলনের কৌশল হিসেবে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং এলাকায় এই প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করা হতে পারে। তবে প্রশাসনিক অনুমতি না পাওয়া গেলে বিকল্প হিসেবে পুরসভার ভেতরেই ধর্না মঞ্চ গড়ার নির্দেশ দিয়েছেন নেত্রী।
বরো-৯ এর নতুন নেতৃত্ব ও ত্রিপাক্ষিক লড়াই
সম্প্রতি বরো-৯ এর চেয়ারপার্সন পদ থেকে দেবলীনা বিশ্বাসের ইস্তফার বিষয়টিও এদিনের বৈঠকে গুরুত্ব পায়। তাঁর শূন্য পদে কাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত নতুন নাম ঘোষণা করা হতে পারে বলে সূত্রের খবর। দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে— আইনি, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক— এই তিন স্তরেই সমান্তরালভাবে লড়াই চালানো হবে।
‘সবটাই নাটক’, পাল্টা তোপ বিজেপির
পুরসভার এই পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ‘নাটক’ বলে কটাক্ষ করেছে বিরোধী শিবির। বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ তৃণমূলের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন:
“পুরসভার অধিবেশনে কেন বিরোধী কাউন্সিলরদের আমন্ত্রণ জানানো হলো না? ওটা তো ফিরহাদ হাকিমের বৈঠকখানা নয়। বিধানসভায় যাঁরা বিরোধীদের অধিকার নিয়ে বড় বড় কথা বলেন, তাঁরাই পুরসভায় তা মানেন না। কলকাতা পুরসভায় আসলে নাটক চলছে।”
আইনি লড়াই ও রাজপথের আন্দোলনের এই দ্বিমুখী কৌশলে আগামী দিনে কলকাতা পুরসভার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।

