পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা নিয়োগেও বেনিয়ম! সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন তোপ, চাকরিপ্রাপকদের তালিকা তলব

পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা নিয়োগেও বেনিয়ম! সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন তোপ, চাকরিপ্রাপকদের তালিকা তলব

পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি নিয়ে দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের মাঝেই এবার রাজ্যের মাদ্রাসাগুলির নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। একটি মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ— উপযুক্ত যোগ্যতা ছাড়াই মাদ্রাসাগুলোতে শুধু ‘পছন্দের’ লোকেদের চাকরি দেওয়া হয়েছে এবং এর পিছনে কীসের লেনদেন হয়েছে, তা সবারই জানা। সুপ্রিম কোর্টের এই নজিরবিহীন মন্তব্যের পর রাজ্য মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মশিহর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চে বর্তমানে এই মামলার শুনানি চলছে। প্রাইমারি, আপার প্রাইমারি, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক নিয়োগের পর এবার মাদ্রাসা শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়ে গেল।

‘সবাই সব জানে’, পরিচালন সমিতির ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ সর্বোচ্চ আদালত

শুনানি চলাকালীন এ রাজ্যের মাদ্রাসাগুলোর পরিচালন সমিতি বা ম্যানেজিং কমিটির (Managing Committee) ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত। তিনি মন্তব্য করেন, “রাজ্যে কয়েক হাজার মাদ্রাসা রয়েছে। সেখানে নিয়োগের সমস্ত দায়িত্ব পালন করে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার পরিচালন সমিতি। কিন্তু তারা নিজেদের পছন্দের লোকেদের উপযুক্ত যোগ্যতা ছাড়াই সেখানে বসিয়ে দিয়েছে।”

এরপরই আর্থিক লেনদেনের দিকে ইঙ্গিত করে বিচারপতির তীব্র পর্যবেক্ষণ, “কীসের বিনিময়ে এই সমস্ত লোকেদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, তা আজ আর কারও অজানা নয়, সবাই সব জানে।”

আদালত আরও নোট করেছে যে, এমন অনেক ব্যক্তিকে শিক্ষক বা অশিক্ষক কর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, যাদের নথিপত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার ন্যূনতম উল্লেখ পর্যন্ত নেই। সম্পূর্ণভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের নিয়মাবলীকে।

মামলার প্রেক্ষাপট ও অধিকারের লড়াই

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মূলত ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসায় ব্যাপক হারে শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করেছিল সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর ম্যানেজিং কমিটি। নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই ‘ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ’ এবং সরাসরি নিয়োগের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা গড়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে।

এই আইনি লড়াইয়ের মূল আইনি বিষয় হলো— মাদ্রাসায় কর্মী নিয়োগের আসল একচ্ছত্র অধিকার কার? সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির নাকি রাজ্য মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের (MSC)? বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে যে সমস্ত শিক্ষাকর্মী ও শিক্ষকেরা মামলা করেছেন, তারা প্রত্যেকেই পরিচালন সমিতির মাধ্যমে চাকরি পেয়েছিলেন এবং এখন নিজেদের চাকরি বাঁচাতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ: তালিকা তলব

আদালত এই অনিয়মকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নিতে রাজি নয়। এই বেআইনি নিয়োগের জাল কতদূর বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে এদিন ডিভিশন বেঞ্চ একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ জারি করেছে।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী:

  • এই মামলায় যুক্ত প্রত্যেক ‘অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড’ (Advocate on Record)-কে নিজেদের মক্কেলদের মধ্য থেকে অন্তত একজন শিক্ষক এবং একজন অশিক্ষক কর্মীর নামের পুঙ্খানুপুঙ্খ তালিকা নিয়ে আদালতে হাজির হতে হবে।
  • সেই তালিকার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নথিপত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতেই পরবর্তী শুনানি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া মনোভাবের পর হাজার হাজার মাদ্রাসা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর ভবিষ্যৎ এখন সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী রায়ের ওপর ঝুলে রইল। রাজ্যবাসীর মতে, সাধারণ স্কুল স্তরের পর মাদ্রাসার এই বেনিয়ম প্রমাণ করে রাজ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে নিয়োগের পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.