একসময় ভবানীপুরকে নিজের ‘বড়বোন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ‘মেজোবোন’ নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর, এই ভবানীপুর কেন্দ্র থেকেই উপনির্বাচনে ৫৮ হাজারের বেশি রেকর্ড ভোটে জিতে নিজের মুখ্যমন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু পাঁচ বছর পর, ২০২৬ সালের মহানির্বাচনে সেই ‘বড়বোন’ ভবানীপুরই মুখ ফিরিয়ে নিল তাঁর থেকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে এবার নিজের ঘরের মাঠেই বিজেপি প্রার্থী তথা বিদায়ী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১০৫ ভোটে পরাজিত হলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ভবানীপুরের বেশ কিছু বুথে তৃণমূল প্রার্থীর ভোট প্রাপ্তির গ্রাফ এতটাই নিচে নেমে গেছে যা রাজনৈতিক মহলের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এমন অনেক বুথ রয়েছে যেখানে পঞ্চাশের গণ্ডিও পার করতে পারেননি ‘ভবানীপুরের ভূমিকন্যা’। এমনকি ২২৭ নম্বর বুথে মাত্র ১২টি ভোট পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুথভিত্তিক ফলাফলের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিসংখ্যান
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মোট বুথের সংখ্যা ছিল ২৬৭টি। প্রতিটি বুথে গড়ে ৪০০ থেকে ৭০০ জন ভোটার ছিলেন। এবারের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এমন অনেক বুথ রয়েছে যেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী একশো ভোটও পাননি।
- ১০০-র কম ভোট পাওয়া বুথ: কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ নম্বর বুথে তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৭০টি ভোট, যেখানে শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ১০৬টি ভোট। অবশ্য এর উল্টো চিত্রও দেখা গেছে কিছু জায়গায়। যেমন ১২ নম্বর বুথে মমতা যেখানে ৫৭০টি ভোট পেয়েছেন, সেখানে শুভেন্দু পেয়েছেন মাত্র ৬০টি ভোট।
- ৫০-এর কম ভোট পাওয়া বুথ: ভবানীপুরের মোট ২৮টি বুথে মমতার ভোট প্রাপ্তি ৫০ বা তার নিচে নেমে গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ১৪ নম্বর বুথে তিনি পেয়েছেন ৪৩টি ভোট, ১৬ নম্বরে ৪২, ২০ নম্বরে ৪১, ২৪ নম্বরে ৪৫, ৭৭ নম্বরে ৪০, ৮৯ নম্বরে ৪১ এবং ১০৫ নম্বর বুথে মাত্র ৩১টি ভোট।
- এছাড়া ১৪৯ নম্বর বুথে ৪৪, ১৫৮ নম্বরে ৪৬, ১৭৬ নম্বরে ২৯, ২৪২ নম্বরে ৪০, ২৪৯ নম্বরে ২৮ এবং ২৬৩ নম্বর বুথে মাত্র ৩০টি ভোট পেয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
২০৭টি বুথে শুভেন্দুর দাপুটে লিড
কমিশনের সার্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরের মোট ২৬৭টি বুথের মধ্যে ২০৭টি বুথেই লিড পেয়েছেন। সেই তুলনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাত্র ৬০টি বুথে নিজের লিড ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন।
যদিও প্রতিদ্বন্দ্বী শুভেন্দু অধিকারীও ৩৯টি বুথে ৫০ বা তার কম ভোট পেয়েছেন, কিন্তু সার্বিক বুথভিত্তিক আধিপত্যের জেরে তিনি শেষ পর্যন্ত ১৫ হাজার ১০৫ ভোটের ব্যবধানে ভবানীপুর কেন্দ্রটি তৃণমূলের থেকে ছিনিয়ে নিতে সফল হন।
২০২১ বনাম ২০২৬: যা ছিল এবং যা হলো
২০২১ সালের ভবানীপুর উপনির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের ফলাফলের তুলনা করলে এক বিরাট ধসের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
| নির্বাচনী বছর | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (তৃণমূল) | শুভেন্দু অধিকারী / নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী (বিজেপি) | জয়ের ব্যবধান |
| ২০২১ (উপনির্বাচন) | ৮৫,০০০+ ভোট | প্রিয়াঙ্কা টিবরেওয়াল (পরাজিত) | ৫৮,০০০+ (তৃণমূলের জয়) |
| ২০২৬ (সাধারণ নির্বাচন) | ৫৮,৮১২ ভোট | ৭৩,৯১৭ ভোট | ১৫,১০৫ (বিজেপির জয়) |
২০২১ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই কেন্দ্রে তৃণমূলের শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জয়ী হওয়ার পর, উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছিলেন। এমনকি গতবার যে ৭০ এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূল সামান্য পিছিয়ে ছিল, উপনির্বাচনে সেই দুটি ওয়ার্ডসহ ভবানীপুরের মোট ৭টি ওয়ার্ডেই বিপুল লিড পেয়েছিলেন মমতা।
কিন্তু ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ভবানীপুরের মানুষ মমতাকে দিয়েছেন মাত্র ৫৮,৮১২টি ভোট। অন্যদিকে, শুভেন্দু অধিকারী ৭৩,৯১৭টি ভোট পেয়ে ভবানীপুরের নতুন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। নন্দীগ্রামের পর কলকাতার বুকে মমতার এই ঘরের মাঠে শুভেন্দুর জয় রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন যুগের সূচনা করল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

