বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদনে বড় পদক্ষেপ নিল কেন্দ্র। বিপুল পরিমাণ কয়লা ভাণ্ডারকে কাজে লাগিয়ে ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’ বা কয়লা-ভিত্তিক গ্যাস উৎপাদন প্রকল্পে বড়সড় উৎসাহভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভা। বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অর্থনৈতিক বিষয়ক কমিটির বৈঠকে এই প্রকল্পের জন্য ৩৭,৫০০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা অনুমোদন করা হয়েছে।
বিপুল বিনিয়োগ ও লক্ষ্যমাত্রা
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানান, এই সরকারি সহায়তার ফলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রায় ৩,০০০ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন টন কয়লা গ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা অর্জন করা। প্রাথমিক পর্যায়ে ৭ কোটি ৫০ লক্ষ টন কয়লা থেকে গ্যাস উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প স্থাপন করা হবে।
কোল গ্যাসিফিকেশন: প্রযুক্তির মেলবন্ধন
শিল্প-প্রযুক্তির ভাষায় ‘কোল গ্যাসিফিকেশন’ হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেখানে কয়লাকে সরাসরি না পুড়িয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপের মধ্যে বাষ্প এবং সীমিত অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ‘সিনগ্যাস’ বা ‘সিন্থেসিস গ্যাস’-এ রূপান্তর করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সুবিধাগুলি হলো:
- বিকল্প জ্বালানি: এটি মিথানল, সার, হাইড্রোজেন এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
- আমদানি হ্রাস: বর্তমানে ভারত তেলের ক্ষেত্রে ৮৩%, মিথানলে ৯০% এবং অ্যামোনিয়া আমদানিতে ১৩-১৫% বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রকল্প সফল হলে আমদানির বোঝা অনেকটাই কমবে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও আত্মনির্ভরতা
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এবং ইরান যুদ্ধের আবহে খনিজ তেল ও গ্যাসের আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের মজুত কয়লাকে কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভর হওয়ার ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, ‘‘দেশে বর্তমানে ৪০১ মিলিয়ন টন কয়লা মজুত রয়েছে, যা আগামী ২০০ বছরের জন্য যথেষ্ট। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের প্রয়োজনীয় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আত্মনির্ভর হওয়ার লক্ষ্যে কোল গ্যাসিফিকেশন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।’’
জ্বালানির মূল ভিত্তি কয়লা
বর্তমানে ভারতের মোট জ্বালানি চাহিদার ৫৫ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয় কয়লা। বিশ্বে কয়লার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ও ভোক্তা হিসেবে ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তির চাহিদা মেটাতে কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। তবে সরাসরি কয়লা পোড়ানোর চেয়ে গ্যাসীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের শিল্পক্ষেত্রে যেমন গতির সঞ্চার হবে, তেমনই বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে ভারতীয় অর্থনীতি আরও মজবুত হবে বলে আশা করছে মোদী প্রশাসন।

