কাকদ্বীপকে নতুন জেলা করার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, ২০২৯-এর মধ্যে মুড়িগঙ্গা সেতু উদ্বোধনের আশ্বাস

কাকদ্বীপকে নতুন জেলা করার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর, ২০২৯-এর মধ্যে মুড়িগঙ্গা সেতু উদ্বোধনের আশ্বাস

দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপকে নতুন জেলা হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সুন্দরবন অঞ্চলের বাসিন্দাদের প্রশাসনিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সমস্ত দ্বীপকে একসূত্রে বেঁধে ‘সুন্দরবন মডেল’ তৈরি করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। শনিবার কাকদ্বীপ স্টেডিয়ামে সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ জনপরিষেবা প্রদান কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর শংসাপত্র দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনকে সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে কাকদ্বীপ মহকুমার অধীনে রয়েছে কাকদ্বীপ, নামখানা, পাথরপ্রতিমা ও সাগর—এই চারটি ব্লক। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের জন্য কিছুটা সময় লাগলেও কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা করা হবে। তাঁর কথায়, ‘‘প্রশাসনিক ভাবে যখন বিভক্ত করা হবে… দু’বছর পরে হলেও কাকদ্বীপকে জেলা করব। সুন্দরবনকে মডেল করব এবং সবগুলো দ্বীপকে জুড়ে দেব।’’

সুন্দরবন অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি সমগ্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার জন্যও একাধিক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে পূর্বতন সরকারকে নিশানা করে তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার অর্থ বরাদ্দ করলেও সেই অনুযায়ী উন্নয়নের কাজ করত না। যে অর্থ খরচ করা হত, তার সিংহভাগই দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে পূর্বতন সরকার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু তাঁর দাবি, মাত্র ২০০ কোটি টাকার কাজ হয়েছিল এবং সেই অর্থের ৮০ শতাংশ চুরি হয়েছে। এর বিপরীতে বর্তমান সরকার আট মাসের বাজেটে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জন্য ১২০০ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ করেছে বলে জানান তিনি।

শুভেন্দু বলেন, ‘‘প্রথম দফায় ৫৫৩টি কাজের টেন্ডার হয়েছে। বর্ষা চলে গিয়েছে। এ বার সবগুলো কাজের শুভ সূচনা হচ্ছে। দ্বিতীয় দফায় আরও ২৬৫০টি কাজ হবে।’’

সুন্দরবনের ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় বাঁধ মেরামতির জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, ২০২৯ সালের মধ্যে মুড়িগঙ্গা সেতুর উদ্বোধন করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এই সেতু চালু হলে সুন্দরবন অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিএএ শংসাপত্র নিয়েও শনিবার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশ থেকে জীবন ও ধর্ম রক্ষার জন্য ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের অনুপ্রবেশকারী নয়, বরং শরণার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। দ্রুত তাঁদের সিএএ শংসাপত্র দেওয়ার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক এবং কাকদ্বীপের মহকুমাশাসককে নির্দেশ দেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে যাঁরা প্রাণ আর ধর্ম বাঁচাতে এসেছেন, তাঁরা কিন্তু অনুপ্রবেশকারী নন। তাঁরা শরণার্থী। তাঁদের সবাইকে… ডিএম দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং এসডিও কাকদ্বীপকে বলে গেলাম, অতি দ্রুত সিএএ সার্টিফিকেট দিতে।’’

তিনি আরও জানান, ডিসেম্বরের ১০ তারিখের পর সাগরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। তার পরে ১০ জানুয়ারি সাগরমেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে ফের সেখানে যাবেন। তার আগেই যাতে সমস্ত যোগ্য শরণার্থী সিএএ শংসাপত্র পান, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিবকেও নজর রাখতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তাঁর বক্তব্য, শংসাপত্র পাওয়ার পরে জানুয়ারি মাসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে সিএএ শংসাপত্র পাওয়া এবং ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া পৃথক বিষয়।

এ দিন দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ নিয়েও পূর্বতন শাসকদলকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে হিংসার ঘটনায় নতুন করে এফআইআর দায়ের করার জন্য নির্যাতিতদের আহ্বান জানান তিনি।

শুভেন্দু বলেন, ‘‘নতুন করে এফআইআর করুন। সবগুলোকে জেলে ঢোকাব। আমি কথা দিয়ে গেলাম, ’২১-এর ভোটের পরে যারা অত্যাচার করেছে, তাদের একজনকেও ছাড়ব না। আর যারা আমফান, মনরেগার টাকা লুট করেছে, তাদেরও ছাড়ব না।’’

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের প্রশাসনিক পুনর্গঠন, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, সিএএ শংসাপত্র প্রদান এবং অতীতের দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগের তদন্ত—একাধিক বিষয় উঠে এসেছে শনিবারের কাকদ্বীপের কর্মসূচিতে। তবে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা করার প্রক্রিয়া এবং ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.