আভিজাত্য আর প্রাচীন ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে উত্তর কলকাতার মালাপাড়া অঞ্চলের মল্লিকবাড়ির দুর্গোৎসব এক অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। প্রায় ২৬০ থেকে ২৬৫ বছর ধরে চলে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক পুজো। আঠারো শতকের বিখ্যাত ব্যবসায়ী বৈষ্ণবদাস মল্লিকের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। আদি সপ্তগ্রাম থেকে চুঁচুড়া হয়ে এই পরিবার একসময় কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করে। বর্তমানে দর্পনারায়ণ ঠাকুর স্ট্রিটে অবস্থিত তাঁদের এই ঐতিহাসিক ভদ্রাসন। মূলত ঘড়িওয়ালা মল্লিকবাড়ি, গঙ্গাধর মল্লিক বাড়ি এবং মার্বেল প্যালেস সহ মোট পাঁচটি বাড়ির পুজোর শেকড় জড়িয়ে রয়েছে এই মালাপাড়া মল্লিকবাড়ির সঙ্গেই।
স্বপ্নাদেশ ও ব্যতিক্রমী প্রতিমা পরিবারের আদি পুরুষ বৈষ্ণবদাস মল্লিক ছিলেন পরম বৈষ্ণব। তিনি স্বপ্নে দেবীর এক অপরূপ রূপ দর্শন করেছিলেন, যেখানে দেবীকে শিবের কোলে আসীন অবস্থায় পুজো করা হচ্ছে। সেই স্বপ্নানুযায়ী তিনি কুমোরকে প্রতিমা গড়ার নির্দেশ দেন। সেই থেকে আজও মালাপাড়া মল্লিকবাড়িতে শিব-দুর্গার রূপেই পুজো পান দেবী। বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ অনুসারে এখানে আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়।
শ্রাবণের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে কাঠামো পুজোর মাধ্যমে ঠাকুরদালানে প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হয়। এ বাড়ির দুর্গা-প্রতিমা অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। কুলুঙ্গির অন্দরে শিবের কোলে বসে থাকা দেবী দুর্গার মূর্তিটি দুই বাহুবিশিষ্ট, অর্থাৎ দেবী দ্বিভুজা। তাঁর এক হাত অভয়া এবং অন্য হাত বরদান মুদ্রায় থাকে। বিশেষত্ব হল, এ বাড়ির দেবী ত্রিনয়নী নন, তাঁর দুটি চোখ। দেবীর পদতলে থাকে দুটি ছোট সিংহ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মূর্তি আকারে মূল প্রতিমার তুলনায় খানিকটা বড় হয়। প্রতিমা চালচিত্রের সঙ্গে থাকে গণেশ ও কার্তিক। তবে কার্তিক ছাড়া আর কারোরই হাতে অস্ত্র থাকে না, বরং লক্ষ্মী ও গণেশের হাতে থাকে পদ্মফুল। এছাড়া দেবীর সঙ্গে তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়ার মূর্তি গড়েও পুজো করা হয়।
অনন্য চালচিত্র ও প্রাচীন আলপনা এ বাড়ির চালচিত্রটি একেবারেই অনন্য, যা বাংলার অন্য কোথাও সচরাচর দেখা যায় না। চালচিত্রের মাঝখানে মহিষাসুরমর্দীনির ছবি আঁকা থাকে এবং দুই পাশে অষ্টসখী, দশমহাবিদ্যা তথা বিষ্ণুপুরাণ ও রামায়ণের নানা কাহিনির চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। গত ২৬০ বছর ধরে একই শৈলীতে এই চালচিত্র প্রতি বছর নিখুঁতভাবে আঁকা হয়।
কৃষ্ণ নবমীতে বোধন ঘটস্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পুজো শুরু হয়। যে স্থানে ঘট বসানো হয়, সেখানে ২৬০ বছরের পুরনো নকশা অনুসরণ করেই আজও আলপনা আঁকা হয়। শুধু ঘট বা জয়া-বিজয়া নয়, নবপত্রিকা স্থাপনের জায়গার জন্যও রয়েছে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট আলপনা। বোধনঘরে একটি হোমকুণ্ড রয়েছে এবং বাড়ির ভিতকে সাক্ষী রেখেই হোম করার প্রথা চলে আসছে। পুজোর সময়ে যত ক্ষণ আরতি চলে, তত ক্ষণ অবিরাম যজ্ঞ চলতে থাকে। পুষ্পাঞ্জলির আগে দেবীর উদ্দেশে সোনার চাঁপা ফুল ও সোনার বেলপাতা অর্পণ করা হয়। পুষ্পাঞ্জলি শেষে মল্লিক পরিবারের পূর্বপুরুষদের রচিত বিশেষ স্তব গেয়ে শোনানো হয় দেবীকে, যার জন্য সপ্তাহের প্রতিটি দিনের নির্দিষ্ট আলাদা স্তব রয়েছে।
ভোগ এবং বিশেষ নিয়মকানুন অষ্টমীর দিন পরিবারের বয়ঃজ্যেষ্ঠ মহিলারা পরিবারের মঙ্গলকামনায় মালসায় ধুনো পোড়ান। নবমীর দিন বিশেষ পুজো হয় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে এবং এই দিন প্রায় দুই মণ বাটা চিনির ভোগ নিবেদন করা হয়। দেবীর ভোগে লুচি, তরকারি, মিষ্টির পাশাপাশি গজা, বালুসাই ও বোঁদে পরিবেশন করা হয়। বাড়ির ভিয়েনেই তৈরি হয় বিশেষ পদ— রসকরা এবং চন্দনী ক্ষীর।
পুজোর দিনগুলিতে পরিবারের সকলে সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার করেন। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা সিল্কের চেলি এবং মহিলারা নিয়ম মেনে অষ্টমীতে বেনারসি শাড়ি পরিধান করেন। তবে পুজোর দিনে মল্লিকবাড়ির নারীদের শাড়িতে কালো রঙের কোনো ছোঁয়া থাকা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এছাড়া মহিলাদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নথ ও মল পরার প্রাচীন রেওয়াজ আজও বজায় রয়েছে।
বিসর্জনের দিন ফুলের গয়নায় সাজিয়ে প্রতিমাকে গঙ্গার উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। কাঁধে চড়েই উমা মল্লিকবাড়ি থেকে প্রতিমা বিসর্জনের পথে যাত্রা করেন। প্রতিমা নিরঞ্জনের পাশাপাশি চালচিত্রেরও প্রথাগত বিসর্জন হয়। শতবর্ষ পেরিয়েও আজও তার নিজস্ব আভিজাত্য ও নিয়মের কড়াকড়িতে উজ্জ্বল উত্তর কলকাতার এই ঐতিহাসিক পুজো।

