মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলাতন্ত্র – তৃতীয় পর্যায়

অত্রি ভট্টাচার্যের কার্যক্রম পশ্চিমবঙ্গের আমলা ইতিহাসে একটা অস্বস্তির অধ্যায় হয়ে থাকবে।

মলয় দে-র পদোন্নতি হওয়ায় জায়গায় নতুন স্বরাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব পান তৎকালীন পরিবহণ দফতরের প্রধান সচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব পদটি হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বার ছয়েক বিভিন্ন আমলার নাম স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে চূড়ান্ত করেও তা বাতিল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষে তাঁর পছন্দের, অপেক্ষাকৃত জুনিয়র আমলা তথ্য সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব অত্রি ভট্টাচার্যকে বেছে নেন। অনেকের মতে, এর পরেই কালিমালিপ্ত হয় মমতার শীর্ষ আমলাস্তর।

তথ্য সংস্কৃতি দফতরের প্রধান সচিব থাকাকালীন অত্রিবাবু শহরময় মুখ্যমন্ত্রীর বিশালাকার মুখের ছবি ছড়িয়ে দিতে শুরু করেন শহরময়। অবশ্যই অত্রিবাবু
মুখ্যমন্ত্রীর মন বুঝেই সেই কাজ করেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের ছবিও সময় বিশেষে একটু ম্লান হয়ে যেতে লাগল মুখ্যমন্ত্রীর ওই ছবিতে। বিতর্ক শুরু হয় এ নিয়ে। প্রশ্ন ওঠে, সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ করে এরকম করা যায়? যদিও খুশি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

২০১৭-র ১ জুলাই অত্রিবাবুকেই বেছে নেওয়া হল, স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রধান সচিব হিসাবে। কেন, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরে একাধিক মত রয়েছে। তবে অধিকাংশ আমলার মত হল, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর মেজাজের সঙ্গে অত্রি খুব ভাল খাপ খাইয়ে চলতে পারেন। এটাই ওঁকে দৌড়ে এগিয়ে দিয়েছে।’’ ওই দিন তথ্য ও সংস্কৃতি সচিবের দায়িত্ব পান তৎকালীন উচ্চশিক্ষা সচিব বিবেক কুমার। উচ্চশিক্ষা সচিব হন স্বাস্থ্য দফতরের সচিব আরএস শুক্লা। স্বাস্থ্য দফতরের সচিব হন অনিল ভার্মা। এই তিন আমলাই ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনের সময় মুখ্যমন্ত্রীর নেকনজরে ছিলেন।

জনা দশ অতিরিক্ত মুখ্যসচিব এবং জনা পনেরো তাঁর চেয়ে সিনিয়র আমলা— সব মিলিয়ে জনা পঁচিশ আমলাকে টপকে স্বরাষ্ট্রসচিব হন অত্রিবাবু। ২০১৯ সালে চাকরি থেকে অবসর নেন মলয় দে। তার পরে অবশ্য ‘রীতি’ মেনে চাইলেও মুখ্যসচিব পদে অত্রিবাবুকে আনতে পারতেন না মুখ্যমন্ত্রী। কারণ, তখনও তাঁর অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পদোন্নতি হতে আরও বছর দেড়েক বাকি থাকত। তার পরে মুখ্যসচিব হলে তিনি ওই পদে থাকতেন ২০২৫ সাল পর্যন্ত। অত্রিবাবু যখন স্বরাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব নেন, নবান্নের এক শীর্ষ কর্তার সহাস্য মন্তব্য ছিল , ‘‘বল দেখে খেললে অত্রির সামনে লম্বা ইনিংস খেলার সুযোগ রয়েছে।’’ কিন্তু বিধি বাম।

বেআইনি অর্থলগ্নী সংস্থা সারদা গোষ্ঠী বেশ কিছু সংস্থার বিরুদ্ধে বিনিয়োগে আইনভঙ্গের হরেক অভিযোগ ওঠে। ২০১৩-র এপ্রিলে সারদা-র ঝাঁপ বন্ধ হয়। এরপর মাসে কর্মীদের মাথাপিছু ১৬ হাজার টাকা করে ‘তারা নিউজ’ ও ‘তারা মিউজিকের’ কর্মীদের মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়া শুরু হয়। রাজ্যের প্রচারমাধ্যমে সরকারের বিজ্ঞাপন ও অনুদান নিয়ে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা তদন্ত শুরু করে।

সিবিআই প্রশ্ন তোলে দানের টাকায় চলা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা কেন একটি চ্যানেলকে দেওয়া হল। কেন সরকারি বাজেট থেকেও মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা দেওয়া হয়েছিল? তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের সচিব থাকাকালীনই অত্রি ভট্টাচার্যকে চিঠি দিয়েছিল সিবিআই। জবাবে সরকার জানিয়েছিল, কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এমন সহায়তা করা হয়েছিল। সিবিআই ওই ফাইল চেয়ে পাঠালে সরকার তা দেয়। ফাইল অনুযায়ী, ‘তারা’ চ্যানেলকে টাকা দেওয়ার ‘চূড়ান্ত অনুমোদন’ মুখ্যমন্ত্রী তথা তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিয়েছিলেন।

কিছুকাল বাদে অত্রিবাবুকে স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন দফতরের প্রধান সচিব পদে। ২০১৯-এর ২২ আগস্ট নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংয়ে সিবিআই হানা দেয়। অত্রি ভট্টাচার্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিবিআই। এর পর ২০১৯-এর ৩১ অক্টোবর পর্যটন দফতর থেকে অত্রিবাবুকে সরিয়ে দেওয়া হয় ক্রেতা সুরক্ষা দফতরে। ২০২১-এর ১৩ জানুয়ারি তাঁকে করা হয় প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এটিআইয়ের ডিজি। যেটি পানিশমেন্ট পোষ্টিং হিসাবে চিহ্ণিত।

মুখ্যমন্ত্রীর একদা-ঘনিষ্ঠ আমলা অবসরের আগেই প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চলে যান। ২০২১-এর ২৭ এপ্রিল ক্রেতা সুরক্ষা দফতরের সচিব অত্রি ভট্টাচার্যের তোলা ছবির একটি প্রদর্শনী শুরু হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস-এ।বিভিন্ন সময়ে বিদেশ ভ্রমণের সময় যে সব ছবি তুলেছেন, তার থেকে বাছাই করা ছবি স্থান পেয়েছিল প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীর নাম- ‘পাসিং থ্রু’।

২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মমতার পছন্দের ১১ অফিসারের ভূমিকা। ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ্যমন্ত্রী গোড়াতেই যে ছয় অফিসারের কৃতিত্বের কথা বলেন তাঁরা হলেন, সস্তার চাল বিলির জন্য খাদ্যসচিব অনিল বর্মা, সাইকেল বিলির ব্যবস্থা করা এবং এসসি-এসটি শংসাপত্র বিলির জন্য অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ উন্নয়ন সচিব সঞ্জয় থাডে, কন্যাশ্রী প্রকল্পের জন্য সমাজকল্যাণ সচিব রোশনি সেন, সংখ্যালঘু উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য দফতরের দুই প্রাক্তন সচিব খলিল আহমেদ ও পারভেজ বি সেলিম এবং রাস্তাঘাটের হাল ফেরানোর জন্য পূর্তসচিব ইন্দিবর পাণ্ডে। এছাড়াও তাঁর ’১৬-র জয়ে শিক্ষাসচিব বিবেক কুমার, পর্যটনসচিব অজিত বর্ধন, ক্ষুদ্রশিল্প সচিব রাজীব সিংহ এবং কৃষি দফতরের হাল ফেরানোর জন্য বর্তমান স্বাস্থ্যসচিব আরএস শুক্লের বিশেষ অবদান ছিল বলে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন। তাঁর মতে এই দফতরগুলির মাধ্যমে যে কাজ হয়েছে মানুষ তা উপলব্ধি করেছে এবং ভোটে তার প্রতিফলন মিলেছে।

একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মহলে মুখ্যমন্ত্রী সে সময়ে বলেন, ‘‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলি সফল ভাবে পরিচালনার জন্য অর্থের প্রয়োজন ছিল। সেই কাজে অর্থসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীর বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে।’’ প্রবল চাপ এবং কষ্টের মধ্যেও দ্বিবেদী টাকা জোগাড় করেছেন বলে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেন। আর সবার উপরে মুখ্যসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্বরাষ্ট্রসচিব মলয় দে তো ছিলেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচিব থাকাকালীন মলয়বাবুর অবদান স্বীকার করেন মুখ্যমন্ত্রী।

ওই আমলারা পরবর্তীকালে কোথায়, কী ধরণের দায়িত্ব পেলেন? গত ২ জুলাই ১৯৮৯ ব্যাচের আইএএস অনিল বর্মা হন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। গত ২০ জানুয়ারি ’৯৩ ব্যাচের রোশনি সেন গণশিক্ষা ও গ্রন্থাগার পরিষেবা দফতরের পাশাপাশি রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ দফতরের প্রধান সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে গত ২২ মার্চ ফিরহাদ হাকিম পুর প্রশাসকের দায়িত্ব ত্যাগ করেন। কলকাতা পুরসভার দায়িত্ব দেওয়া হয় পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের সচিব অভিজ্ঞ আইএএস খলিল আহমেদকে। ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস ইন্দিবর পান্ডে ইতিমধ্যে চলে যান কেন্দ্রের ডেপুটেশনে। তাঁকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিশেষ সচিবের দায়িত্ব পান। গত ৭ এপ্রিল তাঁকে কেন্দ্রে প্রশাসনিক সংস্কার, জন অভিযোগ ও পেনশন দফতরের সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতি পছন্দের আমলা ছিলেন ১৯৯০-এর আইএএস বিবেক কুমার। অত্রি ভট্টাচার্য তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকে অপসারিত হওয়ার পর সুভদ্র বিবেকবাবুকে ওই দফতরের দায়িত্ব দেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর তাঁকে নিয়ে আসেন স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান সচিব করে। ২০২০-তে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান সচিব হন দু’জন অভিজ্ঞ আইএএস মনোজ অগ্রবাল এবং সুব্রত গুপ্ত। তাঁদের কাজে আস্থা রাখতে না পেরে অন্য বিভাগে সরিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্যসচিব করে নিয়ে আসেন বিবেক কুমারকে।

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব প্রীতি সুদন ২০২০-র ৩০ এপ্রিল রাজ্যকে চিঠিতে জানান, কেন্দ্রের তালিকায় বঙ্গে রেড জ়োনের সংখ্যা চার থেকে বেড়ে হয়েছে ১০। প্রতিবাদ জানায় রাজ্য। প্রতিবাদপত্রে রাজ্যের করোনা-রোগীর সবিস্তার তথ্য দিয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার জানান, রেড ও অরেঞ্জ জ়োনে পশ্চিমবঙ্গে ‘কেস রিপোর্ট’ হয়েছে মোট ৯৩১টি! অথচ ৩০ এপ্রিল রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের মেডিক্যাল বুলেটিনে জানানো হয়, ওই দিন রাজ্যে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭২! এই নিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সরব হয় বিরোধী শিবির। ওই মেডিক্যাল বুলেটিনে থাকা ‘অ্যাক্টিভ কোভিড কেস’, সুস্থ হয়ে ছাড়া পাওয়া এবং করোনা-কারণে অথবা কো-মর্বিডিটি বা অন্য রোগভোগে মৃতের সংখ্যার যোগফলের সঙ্গে কেন্দ্রে পাঠানো রাজ্যের করোনা-তথ্যে কেন অমিল, সেই প্রশ্ন ওঠে। বিড়ম্বনায় পড়ে রাজ্য সরকার সংশোধিত তথ্য দেওয়ার কথা জানালেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। বরং তার পর থেকে স্বাস্থ্য দফতরের বুলেটিনের ধরন যায় বদলে।

রাজ্যে করোনা-রোগীর সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের আবহে সরে যেতে হল বিবেক কুমারকে। তবু অন্য দফতরে বদলির প্রাক্‌-মুহূর্তে গানের সুরে যেন নিজের কথাই বলে গেলেন স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমার। স্বাস্থ্য ভবনে তাঁর বিদায় সংবর্ধনায় ছিলেন অনেক প্রশাসক-চিকিৎসক। সুগায়ক বিবেক কুমার সেখানে ধরলেন কিশোরকুমারের গান, ‘মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, না ঘর হ্যায় না ঠিকানা…।’

এবার স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান সচিব হন ১৯৯৮ ব্যাচের আইএএস পরিবহণ দফতরের প্রধান সচিব এন এস নিগম। এর পর বিবেকবাবুকে পাঠানো হয় ওয়েষ্ট বেঙ্গল ভ্যালুয়েশন বোর্ডের চেয়ারম্যান। আমলাদের কাছে এই পদটা মোটেই সম্মানজনক নয়।

২০১৬-র নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফল্যের নেপথ্যনায়করা এভাবে ছড়িয়ে পড়েন প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে।
১৯৮৯-এর আইএএস অজিত বর্দ্ধন যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দফতরের পাশাপাশি জলপাইগুড়ি ডিভিশনের কমিশনারের দায়িত্ব পান। ২০১৯-এর ২৮ মে জনস্বাস্থ্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব। ১৯৮৬-র আইএএস আর এস শুক্লা গত ১৭ এপ্রিল সংসদ বিষয়ক মন্ত্রকের সচিবের দায়িত্ব নেন।

১৯৮৫ সালের ব্যাচের আইএএস অফিসার মলয় দে ২০১৭ সালে রাজ্যের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৯-এর ৩০ সেপ্টেম্বর অবসর নেন তিনি। তার আগে পরবর্তী মুখ্যসচিবের নাম ঘোষণা করল নবান্ন। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজীব সিনহাকেই পরবর্তী মুখ্যসচিব হিসেবে বেছে নেয় রাজ্য সরকার। তিনি ছিলেন স্বাস্থ্যসচিবের দায়িত্বে।

’১৯-এর ২৭ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ট্যুইটে বলেন, ‘আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর আমাদের বর্তমান মুখ্যসচিব মলয় দে অবসর নিতে চলেছেন। রাজ্যের জন্য তিনি অসামান্য কাজ করেছেন। অবসর জীবনের জন্য আমার তরফে তাঁর শুভেচ্ছা রইল।’

রাজীব সিনহা মুখ্যসচিব ছিলেন বছরখানেক। তাঁর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ভাল সমঝোতা ছিল। প্রথামাফিক মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠকে তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। করোনাভাইরাস, আমফানের মতো বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতি সামলানোর জন্য তাঁর প্রশংসা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। অবসরের পর শিল্প দফতরের একটি পদ উপহার পান তিনি।

নয়া স্বরাষ্ট্রসচিব কে হবেন, তা নিয়েও আমলা মহলে গুঞ্জন চলছিল। দৌড়ে ছিলেন কৃষিসচিব সুনীল গুপ্ত, অর্থসচিব হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদী এবং ভূমি ও ভূমিসংস্কার দফতরের সচিব মনোজ পন্থের নামও উঠে আসছিল। বিশেষত গত লোকসভা নির্বাচনের আগে স্বরাষ্ট্রসচিব অত্রি ভট্টাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ায় রাজ্য সরকার বাড়তি সতর্ক থাকবে বলে প্রশাসনিক মহলের অনুমান ছিল। তাই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দায়িত্ব সামলানো সুনীল গুপ্তকে মুখ্যসচিবের পদে বসানো হতে পারে জল্পনা ছড়িয়েছিল।

শেষপর্যন্ত গত ১ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যসচিব পদে নিয়োজিত হন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। এর ক’দিন আগে ট্যুইট করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই এই কথা জানান। নবান্নের তরফে এই বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বর্তমান মুখ্যসচিব রাজীবা সিনহা আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর অবসর নিচ্ছেন এবং তাঁর জায়গায় রাজ্যের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব যায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। আগে পরিবহন, শিল্পের মতো দফতর সামলানোর পাশাপাশি রাজ্য নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সরকারকে বহু বার নানা সমস্যা থেকে বার করে আনার সুবাদে মুখ্যমন্ত্রীর সুনজরে ছিলেন।
২০২১-এর মে মাস পর্যন্ত মুখ্যসচিব পদে থাকবেন ১৯৮৭-র ব্যাচের আইএএস অফিসার আলাপন। রাজ্যে অতিরিক্ত মুখ্যসচিব পদে কর্মরত আমলাদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে সিনিয়র। আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে নিয়োগ করা হল হরিকৃষ্ণ দ্বিবেদীকে। এর আগে তিনি অর্থ দফতরের সচিব ছিলেন।

এর আগেই নিজের অফিসিয়াল ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “আমি এটা জানাতে পেরে খুব আনন্দিত যে বর্তমান স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব নিযুক্ত করা হল। বর্তমান অর্থ দফতরের সচিব এইচ কে দ্বিবেদিকে রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব নিযুক্ত করা হল। অন্যদিকে অর্থ দফতরের সচিবের দায়িত্ব পেলেন মনোজ পন্থ। আগামী ১ অক্টোবর থেকে দায়িত্ব নেবেন তিনজন।”

তাঁর গত এক দশকের শাসনকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যসচিব এবং স্বরাষ্ট্রসচিব ছাড়া বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ, স্বাস্থ্য, পরিবহণ, পূর্ত এবং তথ্য ও সংস্কৃতি প্রভৃতি দফতরকে। এই সব দফতরের অন্তত চার জন আমলা, যাঁরা একসময়ে মুখ্যমন্ত্রীর খুব পছন্দের ছিলেন, সরে যেতে হয় অস্বস্তির মধ্যে। তাঁরা হলেন সঞ্জয় মিত্র, সুব্রত গুপ্ত, অত্রি ভট্টাচার্য এবং বিবেক কুমার। কেন, কোন পরিস্থিতিতে তাঁদের সরে যেতে হল, আগের নানা পর্বে তার আলোচনা রয়েছে।
এভাবে আমলাদের প্রস্থান মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষেই বা কতটা স্বস্তিকর? দীর্ঘদিন প্রশাসনের অন্দরের ওপর চোখ রেখেছেন বরিষ্ঠ সাংবাদিক, একটি নামী দৈনিকের ব্যুরো প্রধান অমল সরকারের মতে, এরকম ঘটনা যে কোনও ক্ষেত্রেই হয়। সংবাদপত্রে চিফ রিপোর্টারের সঙ্গে রিপোর্টারের মতানৈক্য, বিবাদের ঘটনার মতই। এতে মুখ্যমন্ত্রীর অস্বস্তি কেন হবে?

অমল সরকারের মূল্যায়ণ, “বাম আমলের চেয়ে তৃণমূলের ১০ বছরের আমলাতন্ত্রকে আমি গতিশীলতার নিরিখে এগিয়ে রাখব। জ্যোতি বসু তাঁর ব্যক্তিত্ব বা গুরুত্বের জন্য সিদ্ধান্ত রূপায়ণে কিছু সুবিধা পেতেন। কিন্তু সেই সুযোগটা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পাননি। ফলে, কখনও আলিমুদ্দিন, কখনও কৃষক ফ্রন্ট, কখনও কো অর্ডিনেশন কমিটি সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রূপায়ণের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিয়েও পিছু হঠতে হয়েছে। আমলারাও তাই সময়বিশেষে দ্বিধার মধ্যে থাকতেন।
কর্মসংস্কৃতি ফেরাতে বুদ্ধবাবু ‘ডু ইট নাউ’ শ্লোগান চালু করলেও এসব কারণে ওই ভাবনা বাস্তবে রূপ পায়নি। কিছু ক্ষেত্রে আমলারা নানা বাধায় আটকে গিয়েছেন। যেহেতু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চটজলদি কাজ চান এবং তা না পেলে দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যবস্থা নেন, আমলারা চাপের মধ্যে থাকেন। আমলারা জানেন, অন্য কোনও প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংগঠন বিষয়টিতে নাক গলাবে না, তাঁরা প্রকল্পের দ্রুত রূপায়ণের চেষ্টা করেছেন। সে কারণেই কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, সবুজসাথী প্রভৃতি নানা জনমুখী ভাবনা বাস্তবে রূপ পেয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলারা সদাসতর্ক থাকার চেষ্টা করেছেন, তার আর একটা বড় কারণ তৃণমূল স্তরে মুখ্যমন্ত্রী খবর রাখেন। তাঁকে অসত্য বা অর্ধসত্য তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা মুস্কিল। ক্রমাগত অকুস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দেখেন। যেটা বাম আমলে ছিল না। বুদ্ধদেববাবু মূলত পরিচালিত হতেন দলীয় সূত্রের খবর এবং আমলাদের নোটের ওপর।

দীর্ঘকাল সাংবাদিকতার সূত্রে প্রশাসনের অন্দরমহলকে কাছ থেকে দেখেছেন একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের বরিষ্ঠ সাংবাদিক তপন দাস। বাম আমলের শেষ দশ বছরের সঙ্গে তৃণমূল অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দশ বছরের আমলাতন্ত্রের পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “বামেদের শেষ ১০ বছর বুদ্ধবাবু ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর আমলাতন্ত্রের মান আমার কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলাতন্ত্রের মানের চেয়ে ভাল মনে হয়েছে।“ কাকে কত নম্বর দেবেন— এই প্রশ্নের জবাবে তপনবাবু বলেন, বুদ্ধবাবুকে তাঁর প্রথম পাঁচ বছরের জন্য ১০-এ ৭, পরের ৫ বছরের জন্য ১০-এ ৮ দেব। আর মমতাকে প্রথম পাঁচ বছরের জন্য ১০-এ ৫, পরের ৫ বছরের জন্য ১০-এ ৭ দেব।

কারণ, ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তপনবাবু বলেন, জ্যোতিবাবুর মত অতটা না হলেও বুদ্ধবাবু অনেকটাই আমলাদের শ্রদ্ধা বা মান্যতা আদায় করতে পেরেছিলেন। কিন্তু কথাবার্তা, আচরণ এবং স্ট্রিট ফাইটার ইমেজের জন্য মমতা আমলাদের সেই শ্রদ্ধা পাননি। যদিও আমলারা নিজেদের স্বার্থের কথা ভেবে মমতাকে অশ্রদ্ধা দেখানোর সাহসও কেউ দেখাননি। মমতা আর একটা কাজ করেছেন। বেশ কিছু আইএএস মর্যাদায় উন্নীত ডব্লিউবিসিএস ক্যাডারের আমলাকে বেছে বেছে প্রশাসনের দায়িত্ব দিয়েছেন। কিন্তু বুদ্ধবাবুর আমলাতন্ত্রে আমি মমতার তুলনায় বেশি ‘ডায়নামিজম’ অনুভব করেছি।

আর এক বরিষ্ঠ সাংবাদিক সব্যসাচী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “তৃণমূল আমলে আমলাতন্ত্রের যে ব্যাপারটা আমার চোখে পড়েছে অফিসারদের, বিশেষ করে প্রোমোটি আইএএস-দের কাজে অখুশি হলে তাঁদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ জিনিস বাম আমলে আমার চোখে পড়েনি। এর ভাল-মন্দ দুটো দিকই আছে।“

প্রায় চার দশক প্রশাসনে ছিলেন অরবিন্দ মন্ডল। অবসর নিয়েছেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বার্তা বিভাগের প্রধান হিসাবে। তাঁর কথায়, ’১১-র আগে আমলাতন্ত্র ছিল মূলত কালেকটিভ ডিক্টেটরশিপ। গত এক দশকে যা হয়েছে ‘ইন্ডিভিজ্যুয়েল ডিক্টেটরশিপ’। এরও ভাল-মন্দ দুটো দিকই আছে। জ্যোতিবাবুর আমলেই মহাকরণ থেকে সেচ দফতর সল্ট লেকের সেচভবনে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত রূপায়িত করতে অনেক সময় লেগে যায় বাম ও অন্য কর্মী সংগঠনের বাধায়। পরে একই অবস্থা হয় খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিল্প দফতর মহাকরণ থেকে স্থানান্তরে। সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মহাকরণে প্রচুর পোস্টারও পড়ে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি-দুটি বিভাগ নয়, মূল সচিবালয়কে যেভাবে নবান্নে দ্রুততার সঙ্গে সরিয়ে আনেন, তা অভাবনীয়। “
১৯৭৮ থেকে ’৮৩— প্রায় পাঁচ বছর কেন্দ্রের তৎকালীন যোজনা মন্ত্রকে ছিলেন অরবিন্দবাবু। তিনি বলেন, “ওই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেখেছি নীতিনির্দ্ধারণ করতেন রাজনীতিকরা। রূপায়ণে আমলারা। এখনও সেই ধারাটা বজায় আছে। কিন্তু অনেক রাজ্যেই নীতিনির্দ্ধারণ রূপায়ণেও রাজনীতিকরা হস্তক্ষেপ করেন। এই অশুভ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলাততন্ত্র। সেটা পারলে ভাল হত।“

রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব ১৯৭৬ সাঢ়ের আইএএস অর্ধেন্দু সেন ২০১৬ সালের নির্বাচনে ‘আক্রান্ত আমরা’-র প্রার্থী অম্বিকেশ মহাপাত্রের হয়ে প্রচার করেন। বেহালা পূর্ব কেন্দ্রে তৃণমূলের হেভিওয়েট প্রার্থী, কলকাতার তৎকালীন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নির্দল প্রার্থী হন অম্বিকেশবাবু। যাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানাতেই ব্যঙ্গচিত্র পাঠানোর জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই অম্বিকেশবাবুর হয়েই সে বার প্রচারে নামেন অর্ধেন্দুবাবু। তাঁর যুক্তি, রাজ্যের উন্নয়নের জন্য ‘পরিবর্তন’ প্রয়োজন। সেই পরিবর্তনের স্বার্থেই তিনি প্রচারে নামবেন বলে ঠিক করেছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলাতন্ত্র প্রসঙ্গে ‘হিন্দুস্থান সমাচার’-কে অর্ধেন্দুবাবু বলেন, “এটা ঠিক বেশি নিয়ম মানতে গেলে অনেক কাজে অসুবিধা হয়। একনায়ক হলে কতগুলি সুবিধা থাকে। কিন্তু আমলাতন্ত্রের পক্ষে তা ভাল নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলাতন্ত্রে রাস্তাঘাট বা দৃশ্যমান কিছু দিকের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শিল্প, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য— এ সব অবহেলিত থেকেছে। গোড়ার দিকে আচমকা হাসপাতাল অভিযানে গিয়ে একটু নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ দরকার ছিল, তা হয়নি। এই সব ঘাটতি প্রচার দিয়ে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।”

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু প্রসঙ্গে অর্ধেন্দুবাবু জানিয়েছেন, “বাঙালির নেতা হতে গেলে ‘বাঙালি’ না হলেও চলে। চামচে পরিবৃত হয়ে মুড়ি আর আলুর চপ না খেলেও চলে। বরঞ্চ আপনি আশেপাশের লোকজন থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করে নিতে পারেন, যা অন্যেরা অতিক্রম করতে পারবে না, কিন্তু আপনি নিজে পারবেন আপনার বুদ্ধির জোরে। প্রশাসনে এই কৌশল অপরিহার্য। মানসিক উদারতা এবং নিরপেক্ষতা হল সরকারি অফিসারদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ— এ কথা তাঁর কাছেই শেখা। প্রশাসককে দেখে মানুষ মনে করবেন যে তিনি দুই দলের কথাই বুঝতে পারছেন, কিন্তু নিজে দলাদলির ঊর্ধ্বে। এই বিশ্বাস জন্মালেই প্রশাসন চলবে, নয়তো রোজই লাঠিচার্জ করে পথ অবরোধ তুলতে হবে। জেলায় কাজ করতে গিয়ে বারে বারেই এ কথা স্মরণ করতে হয়েছে।“

সমাপ্ত

হিন্দুস্থান সমাচার

অশোক সেনগুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.