লােকসভায় নাগরিকত্ব (সংশােধনী) বিল ২০১৬ টিভির পর্দায় দেখতে দেখতে যখন তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদদের বক্তব্য শুনলাম তখন ছােটবেলার একটা কথা মনে পড়ছিল, কাক কাকের মাংস খায় না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কাক কাকের মাংস না খেলেও বাঙ্গালি বাঙ্গালির মাংস খায়।

যাই হােক মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। যে বিলটি নিয়ে এখন সমগ্র ভারতীয় রাজনীতি উত্তাল সেই নাগরিকত্ব (সংশােধনী) বিল ২০১৬- এর প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু তার বিশ্লেষণ করা যাক।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে জাতির রক্ত সবচেয়ে বেশি ঝরেছিল সেই জাতি অর্থাৎ বাঙ্গালি হিন্দু জাতি, সেই জাতিকে নিয়ে মূলত এই বিলটি।

ভারতবর্ষকে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ করার ফলে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল শুধুমাত্র মুসলমানদের বসবাসের জায়গা হিসাবে। সেখানে অমুসলমানদের জায়গা কতটুকু সুরক্ষিত সেটা বােঝা যায় দেশভাগের পর সেখানকার হিন্দুদের করুণ পরিণতি এবং ধর্মীয় কারণে উৎখাত হওয়ার ঘটনার রক্তাক্ত পুনরাবৃত্তি দেখে।

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া ভারতে যখনই কোনও ঘটনা ঘটে তখন তার প্রকোপ গিয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গে বসবাসরত হিন্দুদের উপর। সে ১৯৬৪ সালে পূর্ববঙ্গের দাঙ্গাই হােক বা ১৯৯২ সালে বাবরি ধাঁচা ধ্বংসের পরই হােক বা ২০০১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পরই হােক বা ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে সংঘটিত হওয়া হিন্দু নিধন যজ্ঞই হােক।

১৯৬৪ সালে জেহাদিরা যখন জম্মু কাশ্মীরের হজরত বাল মসজিদে রাখা হজরত মহম্মদের চুল চুরি হয়ে গিয়েছে বলে গুজব রটিয়ে দেয় তখন ইসলামি ধর্মান্ধদের প্রকোপ গিয়ে পড়ে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের দোকান, ঘরবাড়ি এবং হিন্দু মা বােনেদের উপর। জম্মু কাশ্মীর যেহেতু ভারতের অংশ এবং ভারত মানেই হিন্দুদের দেশ, তাই ধর্মান্ধদের কোপ গিয়ে পড়ে হিন্দুদের উপর।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বেছে নেয় নিরীহ হিন্দুদের। অসংখ্য হিন্দু মা বােনদের ধর্ষণ করা হয় এবং মুসলমান না হওয়া হিন্দু পুরুষদের প্রকাশ্যে হত্যা করে। জাতিগত নির্মূলীকরণের খেলায় মেতেছিল পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের পােষ্য বাংলাদেশী দোসর আলবদর রাজাকার ও আল শামস নামক বাহিনী।

পাক ভারত যুদ্ধে পরাজয়ের শােধ তুলতে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশে হিন্দুদের সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি বলে ঘােষণা করে। এইভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ হিন্দুদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নামে প্রভাবশালী মুসলমান এবং মুসলমান রাজনীতিবিদেরা সেগুলাে দখল করে।

শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রত্যক্ষ সাহায্যে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভারতের সাহায্য নিয়ে পাক কারাগার থেকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে আসা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রু সম্পত্তি নামক আইনটি নিষিদ্ধ করেননি। হিন্দুদের সম্পদ বঞ্চিত করার রাস্তা খুলে রেখেছিলেন। প্রতিবছর বাঙ্গালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজার সময় জেহাদি গােষ্ঠী মুখিয়ে থাকে মন্দির ভাঙার প্রতিযােগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য।

আমাদের পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের কাছে এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য কোনও সময় নেই। যাঁরা এখানে ভণ্ড ধর্মনিরপেক্ষতা অনুশীলন করেন। কোথায় ছিল তাদের কলম যখন ১৯৯২ সালের ৭ই ডিসেম্বর হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় মন্দির ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আক্রমণ করা হয়। ঢাকায় ভােলানাথ গিরি আশ্রম ধ্বংস ও লুঠ করা হয়। এখানকার ভণ্ড নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী ওই বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না।

আরেকটি বড় ধরনের হিন্দু নিধন যজ্ঞ শুরু হয় ২০১৩ সালে। মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরােধী অপরাধে মিরপুরের কসাই নামে পরিচিত কাদের মােল্লার প্রত্যাশিত ফাঁসির রায় না পেয়ে বাংলাদেশের লক্ষ তরুণ জমায়েত হয় রাজধানী ঢাকার শাহবাগে। ফলে প্রচণ্ড চাপে থাকা ইসলামি দল জামাত এবং প্রধান বিরােধী দল বি.এন.পি মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে ক্ষমতার চাবিকাঠি হিসাবে আবারও বেছে নেয় সংখ্যালঘুদের। দেশব্যাপী একের পর এক মন্দির হিন্দু ঘরবাড়ি এবং বিশেষ করে হিন্দু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানাে হয়। ২০১৪ সালে নির্বাচনের পর আবার শুরু হয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতন, যেখানে অনেক জায়গায় শাসকগােষ্ঠী আওয়ামি লিগের লােকজনও যে জড়িত ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা গ্রন্থ অ্যান ইনকোয়ারি ইনটু কজেস অ্যান্ড সিকোয়েন্সেস অব ডিপ্রাইভেশন অব হিন্দু মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ গ্রু দ্য ভেস্টেড প্রপার্টি অ্যাক্ট বইয়ে লিখেছেন শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইনের আওতায় হিন্দু পরিবারগুলাে যত জমি হারিয়েছে তার মােট আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৯৪৪৬৪০ মিলিয়ন বাংলাদেশি টাকা যা বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা ৫৫ ভাগ এবং ২০০০-২০০১ এ বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি।

আবুল বারকাত একটি বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আনুমানিক ১১.৩ মিলিয়ন হিন্দু ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। তার অর্থ এই যে গড়ে ৬৩২ জন হিন্দু প্রতিদিন দেশত্যাগ করছে। বছরের হিসাবে সংখ্যাটা গিয়ে দাঁড়ায় ২৩০৬১২ জন। তার ৩০ বছরের গবেষণা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন আগামী ত্রিশ বছরের পর বাংলাদেশ হিন্দুশূন্য হবে।

রােহিঙ্গাদের হয়ে পুরাে বিশ্ব কথা বললেও এই নিরীহ বাঙ্গালি হিন্দু জাতির হয়ে একটি টুঁ শব্দ করার লােকও নেই। অথচ ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতমাতার জন্য নিজের প্রাণ বলিদান দিতেও যারা দ্বিধাবােধ করেনি সেই মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার-সহ বাঘাযতীন, উল্লাসকর দত্ত, নীহার মুখার্জি, শিবদাস ঘােষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বীভাভূষণ মিত্র, প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলি, প্রফুল্ল চাকি, সত্যেন্দ্রনাথ মিত্র, কল্পনা দত্ত, বিনােদবিহারী চৌধুরী, সুবােধ রায়, অনন্ত সিংহের উত্তরসূরিদের আজ স্বাধীন ভারতে নাগরিকত্বের জন্য ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে এর থেকে লজ্জার আর কী বা হতে পারে। তারা তাে তাঁদের উত্তরসূরিরা নিজদেশে পরদেশি হবে এই ভেবে রক্ত দেননি।

কিছু স্বার্থলােভী মানুষের অপকর্মের মাধ্যমে দেশকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়ে তাদেরকে পরদেশি বানানাের দায় তাে ওই নিরীহ হিন্দুদের নেই।

এই অভিশপ্ত জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রত্যয়ে পূর্বতন আর এস এস প্রচারক নরেন্দ্র মােদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই বিলটি নিয়ে আসেন ভারতের সংসদে। নরেন্দ্র মােদীর স্বপ্ন ছিল অভিশপ্ত বাঙ্গালি হিন্দু জাতিকে রক্ষা করে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা যেখানে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির পিছনে একটি ইতিহাস রয়েছে।

কী এই পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ইতিহাস যা আমাদের যুব সমাজকে জানতে দেওয়া হয়নি।

১৯৪৬ সালে ক্যাবিনেট মিশন ভারতে আসার পর জিন্নার মদতে সােহরাবর্দির নেতৃত্বে যখন Great Calcutta Killing এবং নােয়াখালি হিন্দু গণহত্যা সংঘটিত হয় এবং ভারতবর্ষের বাঁটোয়ারা হবে নিশ্চিত হয়ে যায় তখন পুরাে Bengal Province (East & West Bengal) পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে নিশ্চিত হয়ে যায়। তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী উপলব্ধি করেন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তানে বাঙ্গালি হিন্দুর অস্তিত্ব রক্ষা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তারই ভিত্তিতে তিনি “বাঙালি হিন্দু Homeland movement শুরু করেন। এই আন্দোলনের অংশ হিসাবে Bengal Provincial Hindu Mahasabha জোরদার প্রচার শুরু করে ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। ওই বছরের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনদিনের একটি সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয় যেটি তারকেশ্বর সম্মেলন নামে খ্যাত, যেখানে অবিভক্ত বাংলা থেকে আগত সমস্ত delegates মিলে একটি Resolution পাশ করে যার মুখ্য বিষয় ছিল শুধুমাত্র বাঙ্গালি হিন্দুদের সুরক্ষিত থাকার জায়গা নিশ্চিত করা। এর থেকে বােঝা যায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কতটা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ছিলেন।

এরপরে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে ২০ জুন ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার সমস্ত বিধানমণ্ডলের হিন্দু সদস্য মিলে ভােট দিয়ে আমাদের এই পশ্চিমবাংলা নামক রাজ্য সৃষ্টি করেন শুধুমাত্র বাঙালী হিন্দুর বসবাসের জায়গা হিসাবে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় সেই পূর্ববঙ্গের হিন্দু বিধায়কদের উত্তরসূরিদের বাঙালি হিন্দুর জন্য সৃষ্টি পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্বের বিরােধিতা করছে মহম্মদ সেলিম-ডেরেক ও ব্রায়নরা। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত বাঙালি হিন্দুদের এই বিষয়টি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

জ্যোতিপ্রকাশ চ্যাটার্জি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.