পুরোহিত ভাতা গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো: দেওয়া নাকি নেওয়াই উদ্দেশ্য?

গতকাল ১৪ই সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের ৮০০০ জন পুরোহিতকে মাসে ১০০০ টাকা করে ভাতা দেবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মুসলিম-তোষণের রাজনীতি করার অভিযোগ বহুদিনের। বস্তুতঃ ২০১১য় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই এ রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়কে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি করে আসছেন তিনি। এ হেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র ৮ মাস আগে হিন্দু পুরোহিতদের ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করায় বিরোধীদের বক্রোক্তি ধেয়ে এসেছে তাঁর দিকে। তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে মেরুকরণের রাজনীতি করার অভিযোগ, হিন্দু ভোট ভাগ করতে চাওয়ার অভিযোগ এবং সর্বোপরি ছন্নছাড়া, শিল্পহীন, রোজগারহীন রাজ্যের সরকারি ট্রেজারির টাকা ভুল কাজে নয়ছয় করার অভিযোগ। শোনা যাচ্ছে, স্টাইপেণ্ড বা ভাতা পাচ্ছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন পুরোহিত ভাতা দেওয়ার।

হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে মাসে ১০০০ টাকা করে ১ জন পুরোহিত বছরে সর্বোচ্চ পেতে পারবেন ১২,০০০ টাকা। এইভাবে ৮০০০ পুরোহিতকে ভাতা দিতে রাজ্যের মোট খরচ হবে বছরে নয় কোটি ষাট লক্ষ টাকা। কিন্তু ২০১৩’র তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ৩০,০০০ ইমাম মাসে ২৫০০ টাকা করে, আর ১৫০০০ মোয়াজ্জেম মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা পেয়ে থাকেন এবং পেয়ে আসছেন। অর্থাৎ ইমামভাতার পিছনে ২০১৩ তেই রাজ্যের খরচ ছিল বছরে নব্বই কোটি টাকা। আর মোয়াজ্জেম ভাতার জন্য খরচ ছিল বছরে সাতাশ কোটি টাকা। অর্থাৎ ইমাম ও মোয়াজ্জিনরা মিলে বছরে মোট ভাতা পেয়েছেন এক’শ সতেরো কোটি টাকা। এই ভাতার পরিমাণ বছরে বছরে বেড়েছে। ২০১৩ ও ২০২০ তে ভাতার পরিমাণ এক নয়। বস্তুতঃ গত ২০১৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ঘোষণা করেছিলেন যে রাজ্যের দুর্গাপুজোগুলিকে ১০,০০০ টাকা করে সরকারি চাঁদা দেবেন, তখন তাঁর সে সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ইমামরা। প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কলকাতার ধর্মতলায় মিটিং করে তাঁরা দাবী জানিয়েছিলেন যে তাঁদের ভাতা ২৫০০ থেকে বাড়িয়ে মাসে ১০,০০০ করা হোক। অর্থাৎ গত ৯ বছরে ইমাম ও মোয়াজ্জেন ভাতার খাতে ওয়াকফ বোর্ডের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঢেলেছে প্রায় এগারো’শ কোটি টাকা।সেই তুলনায় ৮০০০ পুরোহিতের ভাতার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাদ্দ করলেন মাসে ১০০০ টাকা। এটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ২০২১ এর নির্বাচনের আগে বাকি আর মাত্র ৮ মাস। যদি ধরে নিই যে ৮০০০ পুরোহিতকে নিয়মিত সত্যি সত্যিই মাসে ১০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের পুরোহিতদের মোট প্রাপ্তি হবে ছ’কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা মাত্র। ইমাম মোয়াজ্জেমদের এগারো’শ কোটি টাকার পরিপ্রেক্ষিতে পুরোহিতদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী বরাদ্দ করলেন মাত্র ছ’কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ পুরোহিতরা পেতে চলেছেন ইমামরা যা পেয়েছেন তার ০.০০৫৮ ভগ্নাংশ মাত্র। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পুরোহিতরা যা পেতে চলেছেন, ইমাম মোয়াজ্জেমরা ইতিমধ্যেই পেয়েছেন তার ১৭১.৮৮ গুণ বা প্রায় দু’শ গুণ। এর অর্থ হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একজন মুসলিম ধর্মগুরুর গুরুত্ব ও একজন হিন্দু পুরোহিতের গুরুত্বের আঙ্কিক অনুপাত ২০০ : ১. একজন মুসলিম ধর্মগুরু যদি দু’শ টাকা পান, একজন হিন্দু পুরোহিত পাচ্ছেন মাত্র ১ টাকা। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে মুখ্যমন্ত্রী কি তবে দুঃস্থ হিন্দু পুরোহিতদের ভিক্ষা দিয়ে অপমান করতে চাইছেন? নাহলে এই অকিঞ্চিৎকর অর্থরাশি ভোটের মাত্র ৮ মাস আগে তাঁদেরকে দেওয়ার কথা ঘোষণা তিনি করলেন কেন? অবশ্য অনৈতিক দুঃসাহসের রাজনীতির পরাকাষ্ঠা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিক থেকে দেখে দেখে এ রাজ্য অভ্যস্ত।

উঠে এসেছে পুরোহিত-ভাতার রাজনীতির আদত উদ্দেশ্য সংক্রান্ত অপর একটি ব্যাখ্যাও। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, দুঃস্থ পুরোহিতরা পাবেন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়ি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এটিকে “বাংলা আবাস যোজনা” বলে উল্লেখ করে থাকেন। এই আবাস যোজনার বাড়ির যে অর্থমূল্য কেন্দ্রীয় সরকার পাঠায়, তা থেকে শাসকদল যে কাটমানি আদায় করে থাকে, তা এই মুহূর্তে এ রাজ্যের একটি ওপেন সিক্রেট। অর্থাৎ ভোটের আগে আগামী ৮ মাসে একজন দুঃস্থ পুরোহিত যদি নিয়মিত ভাতা পান, তবে সর্বাধিক পেতে পারবেন ৮০০০ টাকা। কিন্তু আবাস যোজনার বাড়ির কেন্দ্রীয় অর্থমূল্য পাওয়ার জন্য তার চেয়ে বেশি টাকা সেই দুঃস্থ পুরোহিতকে কাটমানি দিতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দলকে। অর্থাৎ আদতে দুঃস্থ পুরোহিতরা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছ থেকে পাবেন না কিছুই। বড়জোর পেতে পারবেন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার বাড়ির অর্থমূল্য যার একটি ভালো অংশ আবার চলে যাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের হাতে। অর্থাৎ পুরোহিত-ভাতা দেওয়ার নামে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করার পরিকল্পনাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করলেন কিনা, উঠেছে সে প্রশ্নও।

সেই সঙ্গে উঠেছে পুরোহিত ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনার পিছনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহও। তবে কি আরও কিছু কাটমানি রোজগারের জন্যই ৮০০০ পুরোহিতকে ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনাটি করা হয়েছে? দেওয়া নয়, বরং নেওয়াই কি আদত উদ্দেশ্য? দুঃস্থ পুরোহিতদের নাম করে কেন্দ্রীয় আবাস যোজনার টাকার বেশ খানিক অংশ কাটমানি হিসেবে পার্টিফাণ্ডে ঢোকানোই কি লক্ষ্য? উঠেছে এমন প্রশ্ন।

দেবযানী ভট্টাচার্য্য
(Debjani Bhattacharyya)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.