পাঁচমেশালি সরকার গঠনের ঝুঁকি মানুষ নেবে না

ভারতে ভোট মরশুম চলছে। ভারতবর্ষের দাবি তারাই নাকি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র। হয়তো জনসংখ্যার নিরিখে এ দাবি যথার্থ। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রয়োগ পদ্ধতি কলুষমুক্ত নয়— যেমনটি দেখা যায় অন্যান্য পশ্চাদপদ দেশগুলিতে। ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে অগণতান্ত্রিকভাবে গণতন্ত্রের প্রয়োগের শিরোপা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্য। ২০১৮-র পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে এ বিষয়ে আর কোনো ধোঁয়াশা নেই। শাসকদল নিয়ন্ত্রিত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের পাওয়া গুটিকতক আসন ভয় বা প্রলোভন দেখিয়ে, এমনকী প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারি দলে শামিল করে। এজন্য তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা কবে, কোন পঞ্চায়েত বা পৌরসভা দখলে নেবেন তার তারিখ আগাম ঘোষণা করতেন। নির্বাচনে একটি আসনও না পাওয়া তৃণমূলের বহরমপুর পৌরসভা দখল তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এভাবেই সর্বত্র পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের রাজনৈতিক পরিসর সঙ্কুচিত করেছে তৃণমূল। প্রায় একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে এত তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব তৃণমুলে।
ভারতে গণতন্ত্রের ভিত্তি পঞ্চায়েত পর্যায় হলেও, তার পূর্ণ বিকাশ সংসদীয় গণতন্ত্রে ভারতীয় সংসদকে তাই গণতন্ত্রের পীঠস্থান বা মন্দির বলা হয়। সুতরাং সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিমেয়। তাই প্রত্যেক নাগরিকের এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক বা অপরিহার্য, অন্যথায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি মূল্যহীন হয়ে যায়। ভারতীয় সংবিধান এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিকে নিষ্কলুষ, অবাধ এবং নিরপেক্ষ রাখার জন্য সাংবিধানিক মর্যাদা দিয়ে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। বহুদলীয় রাজনীতিতে ভোট প্রক্রিয়া সরকারি প্রভাবমুক্ত রাখতে এরকম একটি স্বাধীন সংস্থা প্রত্যেক গণতান্ত্রিক দেশের গর্ব। স্বাধীনতার উত্তরকালে ভারতের নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন নির্বাচনে যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এই নিরপেক্ষতা আছে বলেই প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার টিএন সে মাথা উঁচু করে বলতে পেরেছেন, “I am the Election Commission of India-not of the Govt. of India.”বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রে জনমতের ভিত্তিতেই জনপ্রিয় সরকার গঠিত হচ্ছেমসৃণভাবে, নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এমনও দেখা যাচ্ছে, ভোট প্রক্রিয়া চলাকালীন কমিশনের দিকে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগকারীরাই অনেকে নির্বাচিত হচ্ছেন বা সরকার গঠন করছেন। এতেই প্রমাণ হয় কমিশন নিরপেক্ষ। এহেন একটি সাংবিধানিক সংস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক তাগিদে বা স্বার্থে যে বা যাঁরা কালিমালিপ্ত করে লোকচক্ষে হেয় প্রতিপন্ন। করে ভারতীয় গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করছেন, তাদের ঘৃণ্য রাজনীতি যাতে পরাজিত হয়, তা দেখার দায় দেশবাসীর।
যেহেতু গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি তাই তৃণমূল নেত্রী এই লোকসভা ভোটের মুখে। কোনো তথ্য নির্ভর ছবি পাচ্ছেন না বলেই তিনি দিশেহারা। আর এই দিশেহারা এবং অনিশ্চয়তা থেকেই তিনি প্রলাপ এবং পরস্পর বিরোধী কথা বলছেন। তৃণমূল-বিজেপি যোগ ঐতিহাসিক সত্য এবং তৃণমূল নেত্রী রেলমন্ত্রী থাকাবস্থায় বাঙ্গলার জন্য যে কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছেন তাও তো বিজেপি (এনডিএ) সরকারের অবদান, কেননা তিনি তো সরকারের রেলমন্ত্রী ছিলেন। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে তিনি সিপিএম-কংগ্রেসকে বিজেপির দোসর বলছেন। অথচ ওই দুটি দল আদর্শগত এবং বাস্তব রসায়নেই বিজেপি বিরোধী। তৃণমূল নেত্রী প্রতিটি রাজনৈতিক সভায় নিয়মিত বলছেন, প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহ ওকে ভয় দেখাচ্ছেন। আপনি যদি কোনো অনিয়ম না করে থাকেন তাহলে ভয় কীসের? বরং বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, প্রতিটি জনসভায় আপনি বিরোধী ভোটারদের পুলিশের ভয় দেখাচ্ছেন নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর। তাইতো আপনাকে বলতে হয় মনে রাখবেন কেন্দ্রীয় বাহিনী কয়দিন। ভোটের পরে আমার পুলিশই থাকবে। আচ্ছা আপনি বলুন তো, পুলিশ আপনার দলের না রাজ্যের— আর ভোটের পরে পুলিশ থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাহলে পালা করে একথা বলার উদ্দেশ্য কী? ভোট যতই শেষের দিকে তৃণমূল নেত্রী ততই লাগামহীন হচ্ছেন। প্রতিদিন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন— রাজ্যে সমান্তরাল সরকার চালানোর অভিযোগ। তুলে। এমনকী তিনি এবং তার পারিষদবর্গ কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পর্যবেক্ষকদের বিজেপির হয়ে কাজ করার অভিযোগ তুলছেন। অতি উৎসাহী তৃণমূল নেতা-মন্ত্রীদের কেউ কেউ পর্যবেক্ষক বা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল অগ্নিগর্ভ করে তুলছেন। পরিস্থিতি এমন হয়ে যাওয়ায় দুই দফা নির্বাচনে ব্যাপক হিংসা এবং অনিয়মের অভিযোগ, সাংবাদিক নিগ্রহের ঘটনাও ঘটছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশাবলী গুলিয়ে দিয়ে, পর্যাপ্ত বাহিনী থাকা সত্ত্বেও তাদের সময়মতো বুথ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত অফিসারদের বদলিতেই কী এত রোষ? নির্বাচন কমিশনের এসকল ব্যবস্থা তো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের তাগিদে—তাতে আপনার এত ভয় কেন? ভয় পেয়ে আবোল-তাবোল না বকে, কোনো অনিয়ম বা সংবিধান বহির্ভূত কাজ হলে আদালতে যাচ্ছেন না কেন? আপনি পোড়-খাওয়া রাজনীতিক। আপনার জানা আছে— আপনার এ বক্তব্য ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত।
নির্বাচনের দিন ঘোষণা থেকেই বিরোধীদের প্রচারে বাধা দান, প্রার্থীদের উপর হামলা, নেতা-মন্ত্রীরা ভোট কেন্দ্রে ঢুকে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং বিরোধী এজেন্টদের শাসানো এবং মারধরের ঘটনার খবর আসছে। ক্রমাগত বিরোধী রাজনৈতিক পরিসর আটকে দেওয়ার চেষ্টা, তাদের প্রচারে বাধা দানের ফলে মরিয়া হয়ে বিরোধীরাও কোথাও কোথাও সহিংস হয়ে উঠছে। তার দায় সম্পূর্ণ রাজ্য সরকারের—যাঁরা রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কোনো শান্ত্রিপ্রিয়, নিরীহ নির্ভেজাল ভদ্রলোক ভোটকেন্দ্রিক আলোচনা, সমালোচনা প্রকাশ্যে করতে শিহরিত হচ্ছেন। তাদের রাজনীতিতে যোগদানতো দূরস্থান। এ প্রসঙ্গে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কে.আর. নারায়ণনের দিল্লির রামকৃষ্ণ মিশনে ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের আয়োজিত একটি আলোচনাচক্রে বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। অপরিচ্ছন্ন এই অজুহাতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার বিষয়টিকে অবজ্ঞাভরে অবহেলা করলে সর্বাধিক যেমূল্য দিতে হয় সেটা হলো— নিকৃষ্টতর মানুষ কর্তৃক শাসিত হওয়া। সম্মানিত রাষ্ট্রপতির এহেন বক্তব্যের পরেও বর্তমান পরিস্থিতিতে কতজন ভদ্রলোক রাজনীতিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী হবেন তা ভেবে দেখার।
তৃণমূল নেতা-নেত্রীরা যতই আস্ফালন করুন না কেন— ৪২য়ে ৪২, মুখ্যমন্ত্রী গোয়েন্দাসূত্রে প্রকৃত অবস্থা অবহিত আছেন। বলেই এত ভীত-সন্ত্রস্ত। আসলে উনি Trust deficit এ ভুগছেন। আর এই পরিস্থিতির জন্য উনি নিজেই দায়ী। এই আত্মবিশ্বাস হারানোর কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, পুলওয়ামায় আধাসেনার উপরে আক্রমণে জইশ-ই-মহম্মদের জড়িত থাকা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী এর জন্য দায়ী করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। সেখানে থেমে না থেকে বিনা প্রমাণে পাকিস্তানকে দোষারোপ করার জন্য ভারত সরকারের সমালোচনা করেছেন। পাকিস্তান-প্রিয় মুসলমান ভোট ব্যাঙ্কের একাংশকে খুশি করার জন্য। আবার অন্যদিকে বালাকোটে ভারতীয় বিমান হানায় মৃতের সংখ্যা জানতে চেয়ে পাকিস্তানের নৌকায় পাল তুলেছেন। এভাবেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এবং বাঙ্গলায় মুখ্যমন্ত্রীর জাতীয়তাবিরোধী একটি ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। অতএব তৃণমূলের ভোট বাক্সে ঘাটতির সম্ভাবনা। দ্বিতীয়ত, যে কারণে সযত্নে লালিতমুখ্যমন্ত্রীর ‘সততার প্রতীক’ ভাবমূর্তিটি নষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে নারদা-সারদা কাণ্ডে জনগণের টাকা আদালতে খরচ করে সিবিআই তদন্ত ঠেকানোর অসফল প্রচেষ্টা এবং সর্বশেষে সারদা তদন্ত গুলিয়ে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত রাজীব কুমারকে বাঁচানোর জন্য ধরনা। সম্ভবত, মুখ্যমন্ত্রীর ভাবমূর্তিতে শেষ পেরেকটি পোতা হয় সোনাপাচার কাণ্ডে এয়ারপোর্ট থানার অফিসারদের দিয়ে অভিষেক ব্যানার্জির স্ত্রী অভিযুক্ত রুজিরাকে ছাড়িয়ে আনা। ব্যাঙ্কক থেকে ফেরার পথে কলকাতা বিমান বন্দরে রুজিরার সন্দেহজনক ব্যাগ তল্লাশিতে বাধা দিয়ে কাষ্টমস অফিসারদের হাত থেকে রাজ্য পুলিশের অফিসাররা কার নির্দেশে রুজিরাকে ছাড়িয়ে নিল— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রীকে এর জবাব দিতে হবে।
ভারতের গণতন্ত্রকে কালিমালিপ্ত করে পিছনের দরজা দিয়ে যে ক্ষমতা দখল সম্ভব নয়, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তাই ১৯৭৭-৭৮ এর পুনরাবৃত্তি ভারতীয় নির্বাচকমণ্ডলী কখনোই মেনে নেবেন না। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ শিখেছেন— শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ ভারত গঠনে একটি স্থায়ী সরকার দরকার, কোনো পাঁচমিশালি সরকার ভারতের অখণ্ডতা এবং অগ্রগতির নিশ্চয়তা দিতে অপারগ। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ১০ বছরে একটি দুর্বল যুক্তফ্রন্ট সরকারের অভিজ্ঞতা এখনো দগদগে। ভারতের অর্থনীতি যখন শক্ত ভিতে দাঁড়িয়ে, মুদ্রাস্ফীতি গত ৫০ বছরের সর্বনিম্ন, জিডিপি চীনকে ছাড়িয়েছে, বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্যবন্ধু দেশ হিসেবে ভারত উপরের দিকে তখন একটি নড়বড়ে, পাঁচমিশালি সরকার গঠনের ঝুঁকি ভারতবাসী নেবেন না, এটাই প্রত্যাশা।
(লেখক ভারতীয় স্টেট ব্যাঙ্কের অবসরপ্রাপ্ত মুখ্য প্রবন্ধক)
কে. এন. মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.