পাকিস্তানের নামের সঙ্গে অনেক বিশেষণের সঙ্গে আরেকটি বিশেষণ যুক্ত হয়েছে State of Denial। পাকিস্তান তার নীতি বানিয়েছে সন্ত্রাসবাদে মদত দাও এবং পরে তা অস্বীকার করাে। ভারতে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সংবাদপত্র পাকিস্তানের এই নীতির সুযােগ নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানকে একই দাড়িপাল্লায় মাপতে চাইছে। পাকিস্তান সন্ত্রাসের মদতদাতা। অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সরকারি মদত দিয়ে সন্ত্রাসবাদকে প্রক্সিওয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারত তার শিকার হয়েছে। আলােচনার টেবিলে বসলেই বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তা জেনেশুনেও কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পাকিস্তান ও ভারতকে এক করে দেখতে চাইছে। মােদী সরকারের ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে পাকিস্তানকে দায়মুক্ত করতে চাইছে, মুসলমান ভােটব্যাঙ্কের এই রাজনীতি ভারতকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং পাকিস্তানের মনােবল বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইজরায়েল যেভাবে সন্ত্রাসবাদ মােকাবিলা করে ভারত সেভাবে এতদিন করতে পারেনি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইজরায়েলে সেনাবাহিনীতে যােগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তাই তারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সন্ত্রাসের মােকাবিলা করে। ভারতে একশাে কুড়ি কোটি লােকের বাস। এই বিশাল দেশে সন্ত্রাস লােকাল ম্যাটার হয়ে যায়। এতদিন সন্ত্রাসী আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ভরত ঐক্যবদ্ধ হয়নি। এ দুর্বলতা আজকের নয়।
ভারতে ১৯৪৭ সালে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে। নেহরু প্রধানমন্ত্রী হন। তার চারিত্রিক ত্রুটি এবং সমাজবাদের প্রতি মােহ ভারতের মতাে আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন দেশের নেতৃত্ব দেবার অনুকূলে ছিল না। সেই সময়ে নিরাপত্তা পরিচষদের স্থায়ী সদস্য সংখ্যা ৪ থেকে ৫ করার প্রস্তাব নেওয়া হয়। আমেরিকা ১৯৫০ সালে ও রাশিয়া ১৯৫৫ সালে ভারতকে স্থায়ী সদস্য হতে অনুরােধ করে।
সমাজবাদে আস্থাবান নেহরু চীনকে এই পদের উপযুক্ত মনে করে সওয়াল শুরু করেন। পাশ্চাত্য দুনিয়া বিরক্ত হয়। ১৯৬২ সালে চীনা আক্রমণে বিপর্যস্ত ভারত আমেরিকার সাহায্য চায় এবং তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি সাহায্যের হাত বাড়ান। এ ছিল নেহরুর কূটনৈতিক পরাজয় তথা ভারতের পরাজয়। শুধু পরাজয়ই নয়, ৪০ হাজার লােক প্রাণ হারায়। আশ্চর্যের ব্যাপার, তখনও বামপন্থীরা ভারতকেই আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করে। কমিউনিস্ট মানসিকতা ভারতের স্বার্থকে ভূলুণ্ঠিত করে।
১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তানকে দু’টুকরাে করলাে। ৩০ হাজার ভারতীয় সৈন্য আত্মাহুতি দিল। ৯০ হাজার বন্দি সৈন্য পাকিস্তানে ফেরত গেল। আমরা যুদ্ধে জিতেও আলােচনার টেবিলে হেরে গেলাম। পাকিস্তানকে বাগে পেয়ে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী হলাম না। এ ছিল নেতৃত্বের ঐতিহাসিক দুর্বলতা।
ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের আই সি ৪১৪ বিমানটি নেপাল থেকে ১৭৮ জনযাত্রী নিয়ে দিল্লির দিকে যাত্রা করে। পথিমধ্যে তালিবান জঙ্গি কর্তৃক অপহৃত হয়। বিমানটি আরব এমিরেটাস, দুবাই লাহাের হয়ে কান্দাহারে পৌঁছয়। পথিমধ্যে জ্বালানির জন্য অমৃতসর নামে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও মিডিয়া খবর দেখাতে শুরু করে। আত্মীয়স্বজনরা দাবি তােলেন সন্ত্রাসবাদীদের ছাড়াে, আমাদের লােককে মুক্ত করাে। মিছিল মিটিং-সহ প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করা হয়। সমস্ত রাজনৈতিক দলের সহমতে মাসুদ আজহারকে ছাড়া হয়। সেদিন ভারতবর্ষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে পারেনি। ২০০৪ সালে রাশিয়ার বেনশিয়াম রাজ্যে একটি স্কুল মুসলমান সন্ত্রাসবাদীরা দখলে করে। ১০০০ লােককে বন্দি করে। তার অধিকাংশই শিশু। প্রায় ৩৩০ জন শিশুকে হত্যা করা হয়। অন্যান্যদের উদ্ধার হয়। সেদিন রাশিয়ার জনগণ পুতিনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তােলেনি। পুতিন শিশুর জীবনের ওপরে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দিয়েছিলেন। কান্দাহার কাণ্ডে আমরা সরকারের সঙ্গে একাত্ম হতে পারিনি।
কারগিল যুদ্ধের সময় বামপন্থীরা একে match fixing বলে প্রচার চালিয়েছেন। কারগিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনার প্রতি জনগণের আগ্রহ বাড়তে শুরু করে। বিভিন্ন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থেকে সেনাদের খাবারও দেয় জনতা। পাকিস্তান সর্ববিষয়ে State of Denial ছিল। এমনকী সৈনিকদের মৃতদেহও নিতে চায়নি পাকিস্তান।
উরি ও পাঠানকোট আক্রমণের পর ভারত সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে। তাতে জঙ্গি ও পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রমাণ চাইতে শুরু করে। সেনার পরাক্রম নিয়ে প্রশ্ন তােলে। নেতারা এ কাজ করলেও সাধারণ মানুষ সার্জিকেল স্ট্রাইককে সমর্থন ও বিশ্বাস করেছে।
ইমরান খান ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অনেক বুদ্ধিজীবী ইমরান খানের হয়ে সওয়াল শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে লেখা হয় ইমরান খানের আলােচনা প্রস্তাব মােদী না মানলে বিরাট ভুল করবেন। প্রবন্ধের পর প্রবন্ধ ছাপা হয় ইমরান খানকে নিয়ে। ওইসব প্রবন্ধ পড়লে মনে হয় মােদীই আলােচনার পরিবেশ নষ্ট করার জন্য দায়ী।
পুলওয়ামায় সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ভারতবর্ষ নতুন চেহারা নেয় যা ইতিপূর্বে কেউ দেখেনি। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই এক বাক্যে বলেন, পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দাও। মানুষ পাকিস্তানকে যে কোনাে শাস্তি দিতে আগ্রহী। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিমানবাহিনী পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়। গােয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী সেখানে পুলওয়ামা হামলার উৎসব ও পরবর্তী আক্রমণের প্রশিক্ষণ চলছিল। নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বালাকোটে মিসাইলের সাহায্যে আক্রমণ চালানাে হয়। এটা ইজরায়েলের তৈরি মিসাইল। ১২টি ‘মিরাজ ২০০০’ বিমান রাত্রি ৩-২৯ মিনিটে আক্রমণ চালায়। ৫টি এয়ার বেস থেকে বিমানগুলাে আকাশে ওড়ে। স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে বিমানগুলাে টারগেটে আঘাত করে। এই মিসাইলের বিশেষত্ব হলাে টারগেটের সমস্ত পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ৪টি এফ-১৬ ভারতের সেনা ঘাঁটিতে আক্রমণের চেষ্টা করে। ভারতের মিগ-২১ উপরে উঠে এফ-১৬-কে তাড়া করে। ১৯৫৬ সালে মিগ-২১ তৈরি। ১৯৮৬ সালে এফ-১৬ তৈরি। ভারতের বীর সৈনিক অভিনন্দন বর্তমান ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়েন। পূর্ব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ভারত পাকিস্তানের প্রতি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে। একটি Swiess পত্রিকা জানায় ভারত ব্রহ্মোস্ ক্ষেপণাস্ত্র সক্রিয় করে রেখেছে। পাকিস্তানের দিকে লক্ষ্য করে এগুলােকে বসানাে হয়েছে। লক্ষ্য পাকিস্তানের বিমান শক্তিকে ধ্বংস করে দেওয়া। এই কাগজটি আরও জানায় পাকিস্তানের সেনা প্রধান প্রথমে সৌদি আরবে যান এবং সেখানে কড়া নিন্দার সম্মুখীন হন। সৌদি আরব ভারতকে একদিন অপেক্ষা করতে অনুরােধ জানায়। সেই রাতে বাজওয়া তুরস্কে যান কিন্তু তুরস্ক তাকে ফিরিয়ে দেয়। সারা পাকিস্তানে থরহরিকম্প লেগে যায়। বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই প্রসঙ্গে পত্রিকাটি আরও জানায় যে, চীনের নিকট পাকিস্তান স্যাটেলাইট তথ্য চায়। চীন সাহায্য করতে অস্বীকার করে। সারা পৃথিবী পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টি করে। নিরপত্তা পরিষদের স্থায়ী অস্থায়ী সদস্য ১৫টি মধ্যে ভিতর ১৪টি দেশ ভারতের পক্ষে দাঁড়ায়। ভারতের সুচিন্তিত পরিকল্পনায় চীন ও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ফেঁসে যায়। চীনকে সুর বদলাতে হয়। ভারতের কূটনীতিতে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় পাকিস্তান ও চীন সন্ত্রাসের সমর্থক। অন্যদিকে ভারত শুধু সন্ত্রাসবাদকে খতম করতে চায়, পাকিস্তানকে নয়। ইমরান খান শান্তির প্রস্তাব নিয়ে আসে। ভারতের অভ্যন্তরের পাক সমর্থকরা জেগে উঠে। এই নেতাদের কথা পাক মিডিয়া হেডলাইন করে। দেশপ্রেমী ভারতীয়রা ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে। আপামর জনসাধারণ মােদী সরকারকে সমর্থন জানায়। এটা ঐক্যবদ্ধ ভারতের লক্ষণ। নয়া ভারত অতীতের দুর্বলতা কাটিয়ে আত্মশক্তির উপর নির্ভর করে বিশ্বের দরবারে হাজির।
ওয়ার্ল্ডস্ট্রিট জার্নাল ভারতের কূটনৈতিক জয়কে উল্লেখ করে আগামীদিনে ভারত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করে। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস পুলওয়ামা আক্রমণকে দুর্ঘটনা প্রসূত বিস্ফোরণ বলে অভিহিত করে। ওই প্রবন্ধে একবারের জন্য একে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বলেনি। কারণ পরদিনের নিরপত্তা পরিষদের বৈঠককে প্রভাবিত করা নিউইয়র্ক টাইমসের উদ্দেশ্য ছিল। ১৪টি দেশ মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসবাদী ঘােষণার পক্ষে মত দেয়। চীন ও পাকিস্তানকে কূটনৈতিক জালে ফাঁসিয়ে নয়া ভারত শত্রুকে আনত করতে চায়।
ভারত ১২০ কোটি মানুষের দেশ। ঐক্যবদ্ধ ভারতের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকাতে পারলে না এটা প্রমাণিত সত্য। যেভাবে ক্রোধের অগ্নি জনমনে বিস্তারলাভ করেছে তাকে কেউ অবহেলা করতে পারবে না।

নীতীন রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.