২১শে মে যাঁদের মেরে ফেলা হয় তাঁদের স্মরণ করা হয়৷জানিনা আমাদের পরিবারের কথা তখন কারো মনে আছে কিনা!

দিদির ছেলেদের কথা ভাবলে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে,কারণ ওরা একজন খুনি রাজাকারের সন্তান৷আবার ঘৃণাও করতে পারিনা কারণ ওদের মা যে আমার দিদি…….

আমি পেশায় একজন নার্স৷বয়স চুয়ান্ন৷ যদিও কাগজ কলমে সঠিক বয়স জানা নেই৷

আমার মা আমাকে আর আমার দাদাকে নিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন৷

সাল ১৯৭১ আমাদের জীবনের এক বিভীষিকাময় অধ্যায় আমাদের একদিন সব ছিল কিন্তু ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পরিবারটিকে তছনছ করে দেয়।একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা৷ অন্যদিকে বাড়ির ঘটি বাটি থেকে সোনা-টাকা-কাঁসা-পিতল সব লুট হয়ে যায়।

১৯৭১ সালের ২১শে মে বাগেরহাটের আরও অনেক হিন্দু মুসলিমের সাথে
বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে স্থানীয় রাজাকারেরা।

আমাদের নিয়ে মা মানাক্যাম্পের তাঁবুর ঘরে আশ্রয় নিলেন৷ ওখানেই মা খবর পান,দাদু মানে মায়ের বাবাকেও মেরে ফেলেছে৷তিনি থাকতেন চুকনগর নামের একটি জায়গায়৷ মানা ক্যাম্পটা ছিল পাহাড়ি এলাকায়৷আমাদের কার্ড দেয়৷কার্ড থেকে দিত চাল ,ডাল,আলু,পেঁয়াজ সহ সমস্ত জিনিস৷কিছুদিন যাবার পরে কলেরার মহামারি শুরু হয়৷একদিন আমার সাত বছরের দাদা আমাকে ছেড়ে চলে যায়৷মা পাথরের মতন চুপ করে বসে থাকতেন৷অবুঝ আমি,অদম্য প্রাণশক্তির কারণে মরিনি,তাই মায়ের আর আত্মহত্যা করা হয়না৷যা মা অনেক আগে করতে চেয়েছিলেন৷ এ সব শুনতে শুনতে বড় হওয়া৷

আমাদের সাতপুরুষের বাস্তুভিটে ছিল বৃহত্তর খুলনার “বাগেরহাটের ডাকরা গ্রামে”,যে জায়গার নাম নেটে সার্চদিলে নাকি পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাসের নারকীয় গণহত্যার স্থান হিসাবে৷

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মায়ের ফিরে যাবার জায়গা ছিলনা৷কারণ ইতিমধ্যে খবর পাই আমাদের ভিটেমাটি দখল হয়ে গেছে।

দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় বাড়িতে মা উঠলেন৷তারাও কয়েক বছর আগে এসেছেন,অনেক সমস্যা৷এটাই বাস্তব যে আমরা ছিলাম বোঝা৷

মা কয়েকটি বাড়ি রান্নার কাজ জোগাড় করে ঠিক বস্তি নয়,তবে প্রায় তেমন পরিবেশের একটা জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন৷মায়ের চুপচাপ ভাবে থাকা আর মন দিয়ে কাজ করায় সবাই সন্তুষ্ট ছিল৷মা আমাকে সাথে নিয়ে গেলেও কেউ কিছু মনে করতোনা৷আমিও শান্ত ছিলাম৷বাড়িতে এসে মা আমাকে পড়াতেন৷মা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের একটা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ৷

এদিকে মা খেয়ে না খেয়ে আমার শিক্ষা খরচ যুগিয়েছেন আমি কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে ভর্তি হই নার্সিংএ কলেজে।

নার্সিং শেষে চাকরিও পেয়ে যাই৷আমার বিয়ের আগেই আমার স্বামীর সাথে আমার পরিচয় ছিলো একদিন আমার মায়ের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে মায়ের কাছে নিয়ে যাই সেদিন বিয়ের কথা প্রসঙ্গে মা আমাদের পরিবারের এক করুণ অধ্যায়ের পাতা খুললেন। আমার দিদির কথা৷যার কথা আমি কোনদিনই জানতাম না৷

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার চৌদ্দ বছরের বড়দি কে একজন রাজাকার জোর করে নিয়ে বিয়ে করে৷দিদি ছিল লক্ষ্মী প্রতিমার মতন সুন্দরী৷মা বলার পরে আমার আবছা আবছা মনে আসতে থাকে দিদির ছবি৷সে ছিল রজ্জব আলী নামের এক রাজাকার কমান্ডের সদস্য৷মা আমার হাত ধরে অনুরোধ করেন আমরা যেনো কোনোদিন কারো কাছে তা না বলি৷
আমি তখন বুঝতে থাকি কোনোদিন মাকে হাসতে দেখিনি৷ছোটবেলায় শুনতাম মা নাকি ভালো গান করেন কিন্তু আমার জ্ঞান হওয়ার পর কোনোদিন একটুকু গান শুনিনি তাঁর গলায়…৷

আমার বিয়ে হয়,সংসার সন্তান সব আছে,কিন্তু আমিও আর কোনোদিন সেই প্রাণ মন খুলে আর হাসতে পারিনা৷এরপর ফেসবুক জয়েন করে আমি ঐ অঞ্চলের মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে থাকি৷বাবার নাম না বলে দিদির নাম দিয়ে জানতে চাইতাম ৷অবশেষে একজন আমাকে জানায় দিদি মারা গেছে৷ তার দুটি ছেলে যারা বিদেশে থাকে৷আমার ভাবতেই বুক ফেটে যায় দিদির মনের মধ্যে কতটা কষ্ট ছিল..৷

আমার মা মারা গেছেন৷সবার জন্যে পূজা শেষে প্রার্থনা করি রোজ৷বাবা,মা,দাদা, দিদি..৷

দিদির ছেলেদের কথা ভাবলে ঘৃণা করতে ইচ্ছে করে,ওরা এক রাজাকার খুনির সন্তান৷আবার পুরো ঘৃণাও করতে পারিনা কারণ ওদের মা যে আমার দিদি।

কাউকে বলতে পারিনা এই সত্য বেদনার ইতিহাস৷বঙ্গভিটায় এক দিদির লেখা পড়ে তার কাছেই আমার লেখাটা পাঠালাম৷কাউকেতো আমার ব্যথার কথা জানিয়ে কিছুটা হলেও শান্তি চাই৷

শুনেছি ডাকরায় স্মৃতিসৌধ আছে৷ ২১শে মে যাঁদের মেরে ফেলা হয় তাঁদের স্মরণ করা হয়৷জানিনা আমাদের পরিবারের কথা তখন কারো মনে আছে কিনা!

লেখাঃ মালতী মসীদ৷কোলকাতা

বঙ্গভিটা৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.