বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাসের ১৪৫ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

আজ ২৮ জানুয়ারি ২০২২ কলকাতার আরএসএস সদর দফতরের কেশব ভবনে বিপ্লবী পুলিন বিহারী দাসের ১৪৫ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন হল । অনুষ্ঠানে মহান বিপ্লবীর নাতি বিশ্বরঞ্জন দাস ও মনীশ রঞ্জন দাস এই মহাসমাবেশে বক্তব্য রাখলেন। ওয়াডলা ভাগাইয়া, জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউট অফ এশিয়ান স্টাডিজের পরিচালক স্বরূপ প্রসাদ ঘোষ মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

১৯০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিপিন চন্দ্র পাল ও প্রমথ নাথ মিত্রের সফর পুলিন বিহারির ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বিদেশী শাসন শৃঙ্খল থেকে ভারতমাতার মুক্তির জন্য প্রমথ নাথের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে পুলীনবিহারী দাস এগিয়ে আসেন এবং তাঁর উপর ঢাকায় অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠার ভার বর্তায়। অবশেষে সেই বছরেরই অক্টোবর মাসে ৮০ জন যুবকবৃন্দ নিয়ে অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন অনুশীলন সমিতির। তিনি খুব ভালো সংগঠক ছিলেন আর তাই ওনার সাংগঠনিক দক্ষতার গুণে অনুশীলন সমিতির পাঁচ শতাধিক শাখাও স্থাপিত হয়। এরপর তিনি সেই ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ন্যাশানাল স্কুল’ কিন্তু আদতে ওটি ছিল সশস্ত্র বিপ্লবী দল তৈরির একটা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ঢাকার পূর্বতন ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বাসিল কপ্লেস্টন অ্যালেনকে সরানোর এক জবরদস্ত পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। ১৯০৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর অ্যালেন যখন ইংল্যান্ডে ফেরার উদ্দেশে গোয়ালন্দ স্টেশনে পৌঁছলেন ,তখন তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হলে তিনি একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন। এর  কিছু দিন পরেই চারশত জন দাঙ্গাবাজ পুলিন বিহারীর বাড়িতে আক্রমণ করলে তিনি মাত্র কয়েকজন সঙ্গীদের নিয়ে সাহসিকতার সাথে ঐ দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা করেন।


১৯০৮এ ওনাকে ভূপেশ চন্দ্র নাগ, শ্যাম সুন্দর চক্রবর্তী, কৃষ্ণ কুমার মিত্র, সুবোধ মল্লিক, অশ্বিনী দত্ত সহযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মন্টোগোমারি কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা হয় কিন্তু শত অত্যাচার, শত নিষ্পেষণ তাঁর বিপ্লবী সত্তাকে অবদমিত করে রাখতে পারেনি। ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে জেলের অন্ধকার কুঠুরি থেকে বেরিয়ে আসার পর আবার তাঁর বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এই সময়েই অনুশীলন সমিতির ঢাকা দল কলকাতা শাখাটিকে পরিচালনা করতে থাকে। যদিও প্রমথনাথ মিত্রের মৃত্যুর পর এই দুটি দল পৃথক হয়ে যায়।


১৯১০ সালের জুলাই মাসে ৪৬জন বিপ্লবী সহযোগে পুলিন বিহারী দাশকে ঢাকা ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরও ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বিচারে পুলীনবাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া এবং সেলুলার জেলএ স্থানান্তর করা হয় যেখানে হেমচন্দ্র দাস, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, বিনায়ক সাভারকরএর মত বিখ্যাত বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে তিনি আসেন।


১৯১৮ সালে পুলিনের সাজা কিছুটা কমে এবং তাঁকে বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখা হয় এবং ১৯১৯ সালে তাঁকে পুরিপুরিভাবে মুক্তি দেওয়া হয় এবং মুক্তি পাওয়ার পর সমিতির কাজে আত্মনিয়োগ করার চেষ্টা করেন কিন্তু তখন তাঁর সেই সংগঠনকে সরকার নিষিদ্ধ করার ফলে তার সদস্যরা এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়েন। সেই সময় তাঁর সমিতির নিষিদ্ধকরণ হওয়ার ফলে ১৯২০ সালে ভারত সেবক সঙ্ঘ নামে আর একটি দল গঠন করেন। এরপর ব্যারিস্টার এস.আর.দাসের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘হক কথা’ এবং ‘স্বরাজ’ নামে দুটি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং সেখানে গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সমালোচনা করেন। সমিতির কাজ গোপনে চললেও সমিতির সাথে তাঁর বিরোধ এরপর প্রকাশ্যে চলে আসে। এরপর সমিতির সাথে তিনি সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেন এবং ভারত সেবক সঙ্ঘকে ভেঙ্গে দিয়ে ১৯২২ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। ১৯২৮ সালে কলকাতার মেছুয়া বাজারে বঙ্গীয় ব্যয়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। এটা ছিল শারীরিক প্রশিক্ষণের একটি কেন্দ্র এবং কার্যত: একটি আখড়া যেখানে যুবকদের লাঠি চালনা, তলোয়ার চালনা ও কুস্তি শেখানো হত।

মাদারিপুর মহকুমার লনসিং গ্রামের শিক্ষিত স্বছল মধ্যবিত্ত দাস পরিবারে নব কুমার দাসের পুত্ররূপে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন পুলিন বিহারী দাস। পারিবারিক বেশ কিছু জমি জমা থাকা সত্ত্বেও ওনাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা চাকুরীজীবী ছিলেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাদারিপুর মহকুমার সাব ডিভিসনাল কোর্টের উকিল এবং তাঁর খুল্লতাতরা ছিলেন যথাক্রমে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও মুন্সেফ। ১৮৯৪ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হওয়ার হওয়ার পর ঢাকা কলেজএ ভর্তি হন এবং সেইখানে শিক্ষাগ্রহণ কালেই তিনি ঐ কলেজের গবেষণাগারের সাহায্যকারী তথা ব্যবহারিক শিক্ষক হিসাবে কাজ করতে থাকেন। বাল্যকাল থেকেই পুলীনবিহারির শরীরচর্চার দিকে ছিল প্রবল ঝোঁক এবং বাস্তবিক তিনি একজন দক্ষ লাঠিয়ালও ছিলেন। কলকাতায় সরলা দেবীর আখড়ার সাফল্য দেখে তিনি ঢাকায় টিকাটুলিতে ১৯০৩ সালে একটি নিজস্ব আখড়া চালু করেন। ১৯০৫ সালে তৎকালীন বিখ্যাত লাঠিয়াল মুর্তাজার কাছ থেকে লাঠিখেলা ও অসিক্রীড়ার কৌশলও রপ্ত করেছিলেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.