অগ্নিপুরুষ

অবসর নেবার পর টেগার্ট তার স্মৃতিচারণ গ্রন্থে বলেছেন, এই বিপ্লবী যদি ভারতে না জন্মে ইংল্যান্ডে জন্মাতো তবে ট্রাফালগার স্কোয়ারে নেলসনের পাশে এর ও মূর্তি থাকতো‌! এক চিরশত্রুর সম্পর্কে এমন উক্তি, কে তিনি…..? 🍂

১৯০৫ সাল , স্বদেশী আন্দোলনের রাশ টানতে বড়লাট কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিলেন । গর্জে উঠলো বাংলার যুবসমাজ । ঋষি অরবিন্দের অনুপ্রেরণায় গঠিত হলো গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর , কিছুদিনের মধ্যেই সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়লো এর শাখা সংগঠন । লাখো সদস্যের এই সংগঠনে সমন্বয়ের দায়িত্বে রইলেন কুড়ি বছরের এক যুবক, যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যয় । আওয়াজ উঠলো “আমরা মরবো জগত জাগবে ।”
স্বাধীনতা আন্দোলনে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়ের………. অগ্নিযুগ 🔥

বিভিন্ন জায়গায় এরা তৈরী করতে লাগলেন বোমা তৈরির কারখনা , সাহসী যুবকদের উৎসাহিত করে শুরু করলেন ইংরেজ রাজপুরুষদের ওপর আক্রমণ । এরই মধ্যে আলিপুর বোমার মামলায় অরবিন্দ সহ গ্রেফতার হলেন যতীন । এগারো মাস জেলে থেকে তিনি উপলব্ধি করলেন এইভাবে দুচারজন ইংরেজ মেরে স্বাধীনতা আনা যাবেনা , দরকার ১৮৫৭ সালের মতন আরো একটা দেশজুড়ে সর্বাত্মক বিপ্লব । ১৯১২ সালে কলকাতা এসেছিলেন জার্মানির যুবরাজ দ্বিতীয় উইলহেম । শত্রুর শত্রু বন্ধু এই নীতি নিয়ে যতীন একদিন দেখা করলেন তার সাথে, খুলে বললেন তার উদ্দেশ্য । বৃটিশ শাসন উৎখাতের জন্য চাইলেন অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ । ইউরোপ ভূখণ্ডে সেসময় শুরু হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যতীন দেখলেন সশস্ত্র অভ্যুত্থানের এটাই প্রকৃত সময় ।

নির্বাসিত ভারতীয় বিপ্লবী যারা সেসময় জার্মানী ও আমেরিকা ভূখণ্ডে কাজ করছিলেন, তাদের সবাইকে নিয়ে এলেন এক ছাতার তলায় । সরোজিনী নাইডুর ভাই বীরেন্দ্রনাথ সেসময় জার্মানিতে গড়ে তুলেছিলেন বার্লিন কমিটি, যতীনের ডাকে সাড়া দিয়ে তারাও জার্মান প্রশাসন কে রাজী করালো অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্যের জন্য । আমেরিকা থেকে লালা হরদয়াল ও তার গদর পার্টিও বাড়িয়ে দিলো সহযোগিতার হাত । যতীন নিজে ফোর্ট উইলিয়ামের দেশীয় সেনাদের সাথে কথা বলা শুরু করলেন ।

এর মধ্যে যুগান্তর পার্টির সদস্যরা রডা কোম্পানীর আমদানী করা প্রচুর পিস্তল কায়দা করে সরিয়ে ফেললো আর গার্ডেনরীচে দিনের বেলাতেই লুট করে নিল বার্ড কোম্পানীর টাকা । এই ঘটনায় যতীনের নাম সামনে আসায় উনি পালিয়ে যান উড়িষ্যার ময়ুরভঞ্জে । বার্লিন থেকে এসময় খবর আসে SS Maverick নামে এক জার্মান জাহাজ মেক্সিকোর বন্দর থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার রাইফেল ও গোলাবারুদ নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে । জাভা হয়ে সেটি উড়িষ্যার উপকূলে আসবে । যতীন তার সহযোগী MN Roy কে এটির তদারকির ভার দেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি ইন্দোনেশিয়া যাত্রা করেন । সেখানে সবকিছু ব্যাবস্থা করে 1915 সালের জুন মাসে মাদ্রাজে ফিরে আসেন ও যুগান্তর সদস্য যাদুগোপাল মুখার্জীকে টেলিগ্রাম পাঠান …….
“…arrived here, starting tonight for Balasore, expect to meet someone there.”
দুর্ভাগ্যক্রমে এই টেলিগ্রামটি ইংরেজ গোয়েন্দাদের নজরে আসে ও তারা এটি পাঠিয়ে দেয় পুলিস কমিশনার চার্লস টেগার্টের কাছে ।

দুর্ভাগ্য কখনো একা আসেনা, গদর পার্টির এক বেইমান এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেয় মার্কিন গোয়েন্দাদের । আবার যে জার্মান অফিসারের ওপর অস্ত্র বোঝাই করার তদারকির ভার ছিল সেও টাকা খেয়ে এই খবর বৃটিশ গোয়েন্দাদের জানিয়ে দেয় । SS Maverick কোনদিনই আর ভারতীয় উপকূলে পৌঁছালো না !
কলকাতার বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়ে যায় ব্যাপক তল্লাশী, পুলিশের হাতে আসে ময়ুরভঞ্জের কাপ্তিপদা বলে এক জায়গার নাম ।

পরের ঘটনাতো সবায়ের জানা ……………. বুড়িবালামের তীরে সামান্য মাউজার সম্বল করে পাঁচ সঙ্গীসহ যতীন আধুনিক অস্ত্রধারী বৃটিশ সেনার মুখোমুখি হন । চূড়ান্ত অসম এই লড়াইও বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলে । আহত অবস্থায় ধরা পড়েন এবং পরদিন বালেশ্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন । জীবিত বাঘা যতীন বাঘের মতনই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন,দিনটা ছিল ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯১৫💥

উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলেও তার এই পরিকল্পনা বৃটিশ শাসনের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয় এমনকি টেগার্ট অব্দি তাঁর মৃতদেহের সামনে টুপি খুলে বলেছিলেন,
‘Bagha Jatin, the Bengali revolutionary, is one of the most selfless political workers in India. His driving power (…) immense: if an army could be raised or arms could reach an Indian port, the British would lose the war.”🥀

জন্মদিনে এই মহান বিপ্লবীকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি 🌹 🌲 সংকলনে ✍🏻- ©️ স্বপন সেন ‌🌲

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.