যিশুকে বিশ্বাসের ‘অপরাধে’ চন্দ্রকোনায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলির ওপর হামলার অভিযোগ, এলাকায় পুলিশি প্রহরা

যিশুকে বিশ্বাসের ‘অপরাধে’ চন্দ্রকোনায় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলির ওপর হামলার অভিযোগ, এলাকায় পুলিশি প্রহরা

যিশুকে বিশ্বাস করা এবং খ্রিস্ট ধর্মের রীতি মেনে চলার ‘অপরাধে’ দুর্গাপুজোর সময় পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় তিনটি পরিবার আক্রান্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্রামবাসীদের একাংশের বিরুদ্ধে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে মারধর করা এবং জোর করে মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে অঞ্জলি দেওয়ানো ও প্রসাদ খাওয়ানোর গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এই ঘটনায় গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। চন্দ্রকোনা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর আক্রান্ত পরিবারগুলির বাড়ির বাইরে পুলিশি পাহারা বসানো হলেও তাদের আতঙ্ক কাটছে না।

ঘটনার বিবরণ চন্দ্রকোনার মনোহরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাতলাপুর গ্রামের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ওই তিনটি পরিবার পুজোর মরসুমে এই হামলার শিকার হয়। আক্রান্ত পরিবারের এক সদস্য লক্ষ্মী মণ্ডলের অভিযোগ, “বাড়ি থেকে বের করে যেভাবে অত্যাচার করা হয়েছে, তাতে আমরা চরম আতঙ্কিত। পুলিশ এখন রয়েছে, কিন্তু যখন থাকবে না, তখন কী হবে?”

তাঁর দাবি, “আমরা যিশুকে বিশ্বাস করি, সেটাই আমাদের অপরাধ। আমাদের জোর করে মণ্ডপে নিয়ে গিয়ে অঞ্জলি দেওয়ানো এবং প্রসাদ খেতে বাধ্য করা হয়েছে।” গ্রামবাসীদের একাংশের তরফে ওই পরিবারগুলি ধর্ম পরিবর্তন করেনি বলে দাবি করা হলেও, লক্ষ্মী বলেন, “আমরা জাত-ধর্ম পাল্টেছি, সেটা আজও বলছি না। আমরা মনেপ্রাণে যিশুকে বিশ্বাস করি। আমরা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছি, তা কোনো নথিতে আছে, সেটা বলছি না।”

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য ঘটনার খবর পাওয়ার পরেই লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন যে এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। ঘটনার পর থেকেই ওই গ্রামে পুলিশি নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সংখ্যালঘু সংগঠনের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দাবি জানিয়েছে খ্রিস্টানদের সংগঠন ‘বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা’ (বিসিপি)। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হেরোদ মল্লিক বলেন, “কোথাও কোনো অন্যায় হলে তা তদন্ত করে দেখা হোক। কিন্তু সেই তদন্ত হচ্ছে না, একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে।” এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এবং পরিকল্পিতভাবে এই কাজ করা হচ্ছে বলে দাবি করে তিনি জানান, আইন হাতে তুলে নিয়ে এ ধরনের আক্রমণ কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না।

সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হেরোদ বলেন, “গত তিন মাসে ৪০-এর বেশি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অথচ মন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলছেন তিনি কিছুই জানেন না! যিনি কিছুই জানতে পারেন না, তাঁকে আর কী জানাব?”

বিসিপি-র দাবি, রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (৯টি)। এ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ৬টি করে, উত্তর ২৪ পরগনায় ৫টি, হাওড়ায় ৪টি, বাঁকুড়ায় ৩টি, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমানে ২টি করে এবং পুরুলিয়া, হুগলি ও কলকাতায় ১টি করে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। চন্দ্রকোনার এই সাম্প্রতিক ঘটনা সেই তালিকাতেই যুক্ত হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.