ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও ‘ভোটচুরি’র অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র আন্দোলনের নেপথ্যে বিদেশি চক্রান্তের ছায়া রয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ফক্স নিউজ’-এর এক ডিজিটাল প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওই সংবাদমাধ্যমের দাবি, ভারতের এই আন্দোলনের সঙ্গে ফ্রান্সে সাম্প্রতিক হিংসাত্মক বিক্ষোভের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। মার্কিন ওই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই দেশের শাসকদল বিজেপি ও প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছেন, আগামী ৩০ বছরেও কংগ্রেস ভারতে ক্ষমতায় আসতে পারবে না এবং পরাজয়ের অজুহাত হিসেবেই তারা ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিস্ফোরক দাবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ফক্স নিউজের সাম্প্রতিক এক ডিজিটাল প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারত, ফ্রান্স ও ইতালি-সহ বিশ্বের ১৩টি দেশের ১০১টি সংগঠনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলিতে তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করছে। প্রতিবেদনে ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ (আইএপি) নামে একটি সংস্থাকে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, তারা ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সহিংস আন্দোলন এবং ভারতে জ্ঞানেশ কুমার-বিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করছে।
এছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র-যুব সংগঠন, কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলির তথাকথিত ‘রেড-গ্রিন নেটওয়ার্ক’ এই কার্যকলাপে জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আঙুল তোলা হয়েছে নিউ ইয়র্ক ও শাংহাই-ভিত্তিক ধনকুবের নেভিল রয় সিংহামের অর্থপুষ্ট বামপন্থী নেটওয়ার্ক এবং ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামে সংগঠনের দিকে।
বিজেপির কড়া আক্রমণ ও শাহের তোপ
ফক্স নিউজের ওই প্রতিবেদনকে হাতিয়ার করে বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মার্কিন মিডিয়ার এই রিপোর্ট প্রমাণ করছে যে কংগ্রেস বিদেশি শক্তির সহায়তায় দেশে অরাজকতা সৃষ্টি এবং সরকার পরিবর্তনের (‘রেজিম চেঞ্জ’) চক্রান্ত করছে। কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান অ্যালায়েন্স প্যারিস’ ও ‘প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনাল’-এর যোগাযোগ রয়েছে দাবি করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘গদ্দার’ বলে আখ্যা দেন তিনি।
অন্য দিকে, দিল্লিতে যমুনা নদী পরিষ্কারের লক্ষ্যে ৮,৯৪১ কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাহুল গান্ধীর বিদেশ সফর নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন। সম্প্রতি রাহুলের বিমানে বসে থাকার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে বিজেপির দাবি ছিল, তিনি চার দিনের ভিয়েতনাম সফরে যাচ্ছেন। সেই প্রসঙ্গ তুলে শাহ বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার দেওয়ার উদ্দেশ্যেই বিরোধীরা এসআইআর-এর বিরোধিতা করছে। রাহুলকে নিশানা করে তিনি মন্তব্য করেন, “দিল্লিতে নামার পর আমার কথা শুনে রাখুন, আগামী ৩০ বছরেও আপনি ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।”
কংগ্রেসের পাল্টা জবাব
বিজেপির সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ একে মোদী-শাহ সরকারের “মিথ্যা প্রচার ও জনগণের নজর ঘোরানোর চেষ্টা” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ভোটচুরি কোনও মনগড়া অভিযোগ নয়, প্রমাণিত সত্য। এর ফলে ১০ কোটিরও বেশি ভারতীয় নাগরিক সংবিধান প্রদত্ত ভোটাধিকার হারানোর মতো সংকটের মুখে পড়েছেন।”
কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দাবি করা হয়েছিল যে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষেই ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের ঘোষণাপত্র দেওয়ার শর্ত জোড়া হয়েছিল। কিন্তু রমেশ মনে করিয়ে দেন, গত ৬ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে শীর্ষ আদালত এমন কোনো অনুমোদন দেয়নি।
রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট ও আরটিআই সূত্রে অস্বস্তিতে কমিশন
ফক্স নিউজের প্রতিবেদন বিশ্বাস করলেও মোদী সরকার কেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনের সাম্প্রতিক রিপোর্ট মেনে নিচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী পক্ষ। রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও জমায়েতের অধিকার’ বিষয়ক বিশেষ দূত জিনা রোমেরোর রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ভারতে যুবসমাজ ন্যায়বিচার ও অধিকারের দাবিতে প্রতিবাদ জানালে তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও কলঙ্কলেপনের মুখোমুখি হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনুজ স্বরূপ তা খারিজ করলেও বিরোধীদের প্রশ্ন, ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ফক্স নিউজের খবরকে কেন শাসকদল পরম সত্য হিসেবে ধরে নিচ্ছে?
অন্য দিকে, ‘ইন্ডিয়া টুডে’-তে প্রকাশিত তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) প্রাপ্ত নথির তথ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অস্বস্তি আরও বেড়েছে। আরটিআই সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী গত ২৬ জুলাই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে এড়িয়েই প্রশাসনিক মতপার্থক্য নিয়ে ক্যাবিনেট সচিবকে পৃথক দু’টি চিঠি পাঠান। ৩০ জুলাই নথিবদ্ধ হওয়ার পর ৫ আগস্ট ক্যাবিনেট সচিবালয় থেকে নির্দেশিকা সহ উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে প্রকাশ পেয়েছিল যে, গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার নির্বাচন কমিশনার সঁধু ও জোশী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ করে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, বেআইনি ভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল এবং ভোটারদের নাম যোগ ও বাদ দেওয়া সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। কমিশন একে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া বলে দাবি করলেও, নতুন আরটিআই তথ্য সামনে আসায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা রক্ষা নিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং শাসক শিবিরের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বৃদ্ধি পেল।

