সরাসরি শারীরিক নির্যাতন না চালালেও গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে নারীরাও সমানভাবে দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন এবং দোষ প্রমাণিত হলে পুরুষ অভিযুক্তদের মতো তাঁদেরও সমপরিমাণ শাস্তি হতে পারে। সম্প্রতি একটি মামলার রায়ে এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষন জানিয়েছে দিল্লি হাই কোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, ভারতীয় দণ্ডবিধিতে গণধর্ষণের যে ব্যাখ্যা ও শাস্তির সংস্থান রয়েছে, তা লিঙ্গভেদের ভিত্তিতে আলাদা হতে পারে না। এই আইনের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষকে সমান হিসেবেই গণ্য করা উচিত। আইনি মহলের একাংশ এই রায়কে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন।
একটি গণধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত এক মহিলার বিরুদ্ধে গঠিত চার্জ বা অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, ওই মহিলা সরাসরি শারীরিক ধর্ষণ না করলেও পুরো অপরাধে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিলেন এবং গোটা প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন। মামলার শুনানিতে অভিযুক্তের আইনজীবী ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ডি ধারাটির প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ভারতীয় আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, তাতে অপরাধী বলতে মূলত পুরুষের কথাই বলা হয়েছে। ফলে ওই নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী কোনো নারীকে এই অপরাধে অভিযুক্ত করা যায় না। যদিও আদালতের বিচারক এই যুক্তি খারিজ করে দেন।
গণধর্ষণের ঘটনায় নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অপরাধের মাত্রা বোঝাতে আদালত ‘যৌথ দায়বদ্ধতা’র ধারণার উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। বিচারপতির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৩৭৬ডি ধারায় এমন এক বা একাধিক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট অভিসন্ধি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করেছেন। অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করা কিংবা অপরাধের উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করে দেওয়া— এই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত যে কোনো ব্যক্তিই আইনের এই ধারার আওতায় পড়তে পারেন। অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তির লিঙ্গ কী, তা এখানে বিচার্য নয়। এমনকি অপরাধ সংঘটনের জন্য তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম কি না, সেটিও এই ধারার ক্ষেত্রে কোনো শর্ত হতে পারে না।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লি হাই কোর্টের এই রায় ভারতীয় ফৌজদারি আইনের দীর্ঘদিনের একটি বড় ফাঁক বা ধূসর জায়গা দূর করতে সাহায্য করবে। দলবদ্ধ যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে নারীদের নির্দিষ্ট ভূমিকা নিয়ে আইনি বিধান এতদিন যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না। এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে অতীতে অনেক সময় নারীরা গণধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগ থেকে সহজেই রেহাই পেয়ে যেতেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কেবল অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া কিংবা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মতো তুলনামূলক লঘু ধারাতেই মামলা সীমাবদ্ধ রাখা হতো। বর্তমান রায়ের ফলে সেই আইনি জট অনেকটাই কাটল। দিল্লি হাই কোর্টের সাফ বার্তা, গণধর্ষণের ঘটনায় কোনো নারী যদি নির্যাতিতাকে জোর করে আটকে রাখা, অপরাধের জন্য প্রলুব্ধ করা কিংবা অপরাধস্থলে পাহারাদারির মতো কোনো কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন, তবে তাঁকেও মূল অভিযুক্তদের মতোই সমান অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তিনি সমান শাস্তির যোগ্য হবেন।

