২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চলাকালে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পা ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। শনিবার নবান্ন থেকে হাসপাতাল-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ করে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই সময় পা ভাঙা নিয়ে ‘মিথ্যা দাবি’ করেছিলেন। আগামী ৯ অক্টোবর নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর এ বিষয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ পাল্টা সুর চড়িয়ে একে ‘কুৎসা ও অপপ্রচার’ বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোট পাওয়া পায়ের ছবি পোস্ট করে তিনি দাবি করেন, চোটের ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পায়ের সফট টিস্যু ও পেশি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা এখনও পুরোপুরি সারেনি।
নবান্নে নথিপত্র প্রকাশ শুভেন্দুর
২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামের বিরুলিয়া বাজারে প্রচারে গিয়ে আঘাত পান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ ছিল, চক্রান্ত করে চার-পাঁচজন ব্যক্তি এসে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির দরজায় চেপে ধরেন। পরবর্তীতে এসএসকেএম হাসপাতাল ও বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেসে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয় এবং চিকিৎসকেরা জানান যে, তাঁর বাঁ পায়ের গোড়ালির হাড়ে গুরুতর আঘাত লেগেছে। ভাঙা পায়ে প্লাস্টার নিয়েই হুইলচেয়ারে চেপে সেবার নির্বাচনী প্রচার চালান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে শনিবার শুভেন্দু অধিকারী ২০২১ সালের ১১ মার্চের বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সের রেডিয়োডায়গনোসিস বিভাগের একটি সিটি স্ক্যান রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে দাবি করেন, ওই নথিতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে— ‘ফ্র্যাকচারের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি’ (No evidence of fracture)।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, “২০২১ সালে মমতার পা ভেঙে দেওয়ার মনগড়া অভিযোগে পুরো নন্দীগ্রামবাসীকে অপমান করা হয়েছিল। অভিযোগ যেমন তদন্তসাপেক্ষ, তেমনই মিথ্যা অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালালেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনী আচরণবিধি শেষ হলেই ৯ অক্টোবরের পর এ বিষয়ে কঠোর তদন্ত শুরু হবে।”
চিকিৎসক ও মেডিক্যাল বোর্ডের বক্তব্যে মিশ্র তথ্য
শুভেন্দু অধিকারীর প্রকাশিত রিপোর্টকে কেন্দ্র করে মুখ খুলেছেন তৎকালীন মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্যরাও:
- মেডিক্যাল বোর্ডের এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান: প্রকাশ্যে আসা রিপোর্টটি মূলত বাঁ হাঁটু সংক্রান্ত সিটি স্ক্যান রিপোর্ট। তবে মমতার আঘাত ছিল গোড়ালি ও পায়ের পাতায়। কেবল হাঁটুর সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখে পুরো আঘাতের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়; এর সঙ্গে এমআরআই এবং এক্স-রে রিপোর্টও মিলিয়ে দেখতে হবে।
- অন্য এক জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের দাবি: এসএসকেএমের বাইরের চিকিৎসক ডেকে এনে ব্যান্ডেজ ও প্লাস্টার করানো হয়েছিল। যা নিয়ে ওই সময় চিকিৎসকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
- চিকিৎসক শ্যামাপ্রসাদ দাস বলেন: “আমি কোনো বাইরের চিকিৎসক হিসেবে সরকারি হাসপাতালে অবৈধভাবে চিকিৎসা করিনি। আমাকে ডাকা হয়েছিল বলে এসএসকেএমে গিয়েছিলাম। মমতার পায়ের পাতায় আঘাতজনিত ফ্র্যাকচার ছিল এবং পায়ের ভেতরের ছোট হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রক্ত জমাট বেঁধেছিল।”
তৃণমূলের পাল্টা জবাব
শুভেন্দুর এই অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, “একজন ব্যক্তির শারীরিক চোট নিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর এই ধরনের রাজনীতি অত্যন্ত রুচিহীন ও আপত্তিকর। মমতাদির পায়ে সত্যিই গুরুতর জখম ছিল এবং চিকিৎসক দলই তার প্রত্যক্ষদর্শী। সফট টিস্যু ও পেশির ওই গভীর আঘাতের কারণে তাঁর পায়ের ফোলা ভাব এখনও স্বাভাবিক হয়নি। উপনির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে এই ধরনের কুরুচিকর রাজনীতি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়।”
উল্লেখ্য, আগামী মঙ্গলবার নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং শুক্রবার তার ভোট গণনা। নির্বাচনী বিধি উঠে যাওয়ার পরেই এ বিষয়ে রাজ্য প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ প্রকাশ্যে আসবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

