ফুটবল বিশ্বকাপে ‘ওয়াটার ব্রেক’ বিতর্ক: বাণিজ্যিক স্বার্থ নাকি খেলোয়াড়দের সুরক্ষা? ফিফাকে বিঁধলেন পোচেত্তিনো-ফান ডাইকরা

ফুটবল বিশ্বকাপে ‘ওয়াটার ব্রেক’ বিতর্ক: বাণিজ্যিক স্বার্থ নাকি খেলোয়াড়দের সুরক্ষা? ফিফাকে বিঁধলেন পোচেত্তিনো-ফান ডাইকরা

মাঠের লড়াইয়ে দুর্দান্ত গোল, কৌশলের দ্বৈরথ আর তরুণ প্রতিভাদের উত্থানে চলতি ফুটবল বিশ্বকাপ বিনোদনের কোনো খামতি রাখেনি। তবে টুর্নামেন্টের এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই মাঠের বাইরের একটি বড় বিতর্ক দানা বেঁধেছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ফিফার (FIFA) নতুন ‘ওয়াটার ব্রেক’ বা জলপানের বিরতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। এই নিয়মকে কেন্দ্র করে ফুটবলবিশ্ব এখন স্পষ্ট দুই শিবিরে বিভক্ত। সমর্থক থেকে শুরু করে ফুটবলার ও কোচ— অনেকেই এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

৯০ মিনিটের ম্যাচ কি এখন চার কোয়ার্টারে?

ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচের দুই অর্ধে ঠিক ২২তম মিনিটে রেফারি ৩ মিনিটের একটি জলপানের বিরতি দেবেন। আমেরিকার তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে ফিফা দাবি করেছিল। কিন্তু বিতর্কের নেপথ্যে রয়েছে অন্য কারণ।

ফিফা সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলিকে এই ৩ মিনিটের বিরতির সময় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন চালানোর অনুমতি দিয়েছে। এর ফলে ফুটবলপ্রেমীদের একটানা ৪৫ মিনিট খেলা দেখার চেনা ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে। সমর্থকদের বড় অংশের অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের সম্প্রচার স্বত্বের খরচ উসুল করতে ফুটবল ম্যাচকে কার্যত চারটি কোয়ার্টারে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য বিজ্ঞাপন থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করা।

ছন্দপতন বনাম কোচেদের সুবিধা: জার্মানি ও ব্রাজিলের উদাহরণ

সমালোচকদের মতে, ফুটবল মূলত ছন্দের খেলা। টানটান ম্যাচের মাঝে হঠাৎ খেলা থামলে দলের কৌশল নষ্ট হয়।

  • জার্মানি বনাম কুরাসাও ম্যাচ: জার্মানি এগিয়ে যাওয়ার পর কুরাসাও সবে সমতায় ফিরেছিল। ঠিক তখনই রেফারি বিরতি ঘোষণা করায় কুরাসাওয়ের তৈরি হওয়া ছন্দ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সুযোগ বুঝে প্রথমার্ধে আরও দুটি গোল করে জার্মানি এবং শেষ পর্যন্ত ৭-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে নেয়।
  • ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচ: অন্য পিঠে, কিছু দল এর সুবিধাও পাচ্ছে। মরক্কোর বিরুদ্ধে প্রথম ২০ মিনিটে ব্রাজিলের নাজেহাল দশা হয়েছিল। ঠিক সময়ে পাওয়া জলপানের বিরতিতে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি ফুটবলারদের মাঠের ধারেই কৌশলগত পরামর্শ দেন। এরপরই ব্রাজিল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। আনচেলোত্তি স্বীকারও করেছেন, ‘‘কোচেদের কাছে কৌশলগত বদল আনার জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’’

ফিফার সিদ্ধান্তকে ধুয়ে দিলেন পোচেত্তিনো ও ফান ডাইক

নেদারল্যান্ডসের তারকা ডিফেন্ডার ভার্জিল ফান ডাইক এই নিয়মের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন:

‘‘বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে জলপানের বিরতির সময় বিজ্ঞাপন দেখানোটা আমার একেবারেই পছন্দ নয়। নিরপেক্ষ দর্শকদের জন্য বিষয়টা চরম বিরক্তিকর। পরিস্থিতি অনুযায়ী যেখানে সত্যিই প্রচণ্ড গরম, সেখানে জলপানের বিরতি দেওয়া হোক; কিন্তু সব ম্যাচে এর কোনো প্রয়োজন নেই।’’

এমনকি আয়োজক দেশ আমেরিকার কোচ মোরিসিও পোচেত্তিনোও এই নিয়মের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পোচেত্তিনো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমার এই বিষয়ট একেবারেই পছন্দ নয়। যেখানে পরিস্থিতি খারাপ, সেখানে দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আমেরিকায় এমন অনেক অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং ছাদ ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা হচ্ছে যেখানে গরমের কোনো প্রশ্নই নেই। সেখানেও কেন এই বিরতি?’’

বিজ্ঞাপনের লোভে বিঘ্নিত সম্প্রচার ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বিরতি শেষ হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে সরাসরি সম্প্রচারে ফিরতে হবে। কিন্তু অনেক সময় সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলি সেই নিয়মও মানছে না। যেমন, আমেরিকার একটি চ্যানেল মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে খেলা শুরু হয়ে যাওয়ার ১০ সেকেন্ড পর বিজ্ঞাপন শেষ করে সরাসরি সম্প্রচারে ফেরে। এই বিষয়ে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট চাঁছাছোলা ভাষায় বলেন, ‘‘এই বিরতি শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা কামানোর একটা ফিকির, খেলোয়াড়দের এতে কোনো লাভ হচ্ছে না।’’

খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে আনা এই নিয়ম শেষ পর্যন্ত ফুটবলের স্বাভাবিক নান্দনিকতা ও গতিকে নষ্ট করে কেবলই বাণিজ্যিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে কিনা— তা নিয়ে ফিফার দিকেই আঙুল তুলছে ফুটবল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.