ভারতের উৎপাদনশীলতা ও জিডিপির তালিকায় এক সময়ের ‘শীর্ষ’ স্থান থেকে নামতে নামতে বর্তমানে ষষ্ঠ স্থানে এসে ঠেকেছে পশ্চিমবঙ্গ। স্বাধীনতার সময় দেশের দ্বিতীয় ধনীতম এই রাজ্যের হারানো অর্থনৈতিক গৌরব কি এবার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? বাংলায় নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই লক্ষ্যেই এক ঐতিহাসিক ও উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় নীতি আয়োগ (NITI Aayog)। আর এই বৃহৎ অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের গুরুদায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়েছে বিশিষ্ট বাঙালি অর্থনীতিবিদ তথা পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের প্রাক্তন সদস্য অশোক লাহিড়িকে, যাঁকে সম্প্রতি নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ (ভাইস চেয়ারম্যান) পদে নিযুক্ত করেছে মোদী সরকার।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী শিল্প উদ্যোগ হতে চলেছে।
বালুরঘাটের প্রাক্তন বিধায়ক এবার নীতি আয়োগের দায়িত্বে
চলতি মাসেই নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেছেন অশোক লাহিড়ি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বালুরঘাট কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। তবে এবারের নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী না করে, তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক ও আর্থিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে নীতি আয়োগের শীর্ষপদে নিয়ে আসে কেন্দ্র।
অতীতে ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা অশোক লাহিড়ির হাত ধরেই এবার বাংলার বন্ধ ও ঝিমিয়ে পড়া শিল্পক্ষেত্রে প্রাণ সঞ্চার করতে চাইছে নয়াদিল্লি। নবান্নে ক্ষমতার পালাবদলের পরেই কেন্দ্র নীতি আয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট তৈরির নির্দেশ দেয়, যার প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
‘অ্যাক্ট ইস্ট’-এর প্রবেশদ্বার হবে কলকাতা: ৪টি প্রধান স্তম্ভে তৈরি হচ্ছে রোডম্যাপ
নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ অশোক লাহিড়ি জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গকে কেন্দ্র করে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা (Supply Chain), পরিকাঠামো, নদীভিত্তিক বাণিজ্য ও ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো কলকাতাকে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
নীতি আয়োগের আধিকারিকদের সূত্রে জানা গেছে, মূলত চারটি প্রধান ক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন শিল্পায়নের রোডম্যাপ তৈরি হচ্ছে:
| প্রধান ক্ষেত্র (Sector) | লক্ষ্য ও পরিকল্পনা |
| ১. সরবরাহ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ | বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের ভৌগোলিক সংযোগকারী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং ডেডিকেটেড পণ্যবাহী করিডর নির্মাণ। |
| ২. বৃহৎ উৎপাদন (Manufacturing) | জুতো, বস্ত্র, রসায়ন, ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং ও বৈদ্যুতিন শিল্পের পুনরুজ্জীবন। খনিজ বলয়ের কাছাকাছি অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক ‘সেমিকন্ডাক্টর করিডর’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা। |
| ৩. জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ | ঝাড়খণ্ড-ওড়িশার কয়লা ও লৌহ আকরিক সমৃদ্ধ বলয়ের সঙ্গে নৈকট্য এবং বঙ্গোপসাগরের জ্বালানিপথের কৌশলগত সুবিধাকে কাজে লাগানো। |
| ৪. দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান | তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান তৈরি এবং কাজের অভাবে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরের মাঠে কাজের সুযোগ করে দেওয়া। |
জরাজীর্ণ অতীত বনাম নতুন সম্ভাবনা
স্বাধীনতার পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শ্রমিক ইউনিয়নের বাড়াবাড়ি এবং প্রশাসনিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বাংলার শিল্পজগৎ ধ্বংসের মুখে পড়েছিল বলে দাবি সমালোচকদের। বাম আমলে সেক্টর ফাইভের আইটি সেক্টর গড়ে উঠলেও তা মূলত কলসেন্টারভিত্তিক ছিল। পরবর্তীতে তৃণমূল জমানায় সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের অভিঘাতে রাজ্যে বৃহৎ পুঁজি বিনিয়োগ এক প্রকার বন্ধ হয়ে যায়। সুযোগের অভাবে বাংলার কৃতী ছাত্রছাত্রীরা বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদমুখী হতে বাধ্য হন। পূর্বতন সরকার পরিকাঠামো ও শিল্পের পরিবর্তে কেবল অনুদান ও উন্নয়নমুখী প্রকল্পের রাজনীতিতে জোর দিয়েছিল বলে দাবি ব্যবসায়ী তথা বিজেপি নেতা শিশির বাজোরিয়ার।
তবে বর্তমানে সল্টলেক ও নিউ টাউনের আইটি হাব এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন আশার আলো দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেন ট্রেড (IIFT)-এর প্রাক্তন অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধরের মতে, রাজ্যে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বৃদ্ধির হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। ব্যান্ডেলের বিশেষ পণ্য, প্রসেসড চিজ ও নতুন জাতের চা রফতানি বাড়িয়ে চাষিদের আয় দ্বিগুণ করা এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে যাওয়ার প্রবণতা রোখা সম্ভব।
আমলাতান্ত্রিক জড়তা ও জমি অধিগ্রহণের চ্যালেঞ্জ
নতুন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের আগমনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরলেও অর্থনীতিবিদদের একাংশ কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের বিষয়ে সতর্ক করছেন। তাঁদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে জমি অধিগ্রহণের সংবেদনশীল ইতিহাস, পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলির দুর্বল আর্থিক কাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁস নতুন শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নীতি আয়োগের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট প্রশাসনিক স্তরে কতটা দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরেই নির্ভর করছে বাংলার অর্থনীতির ভবিষ্যৎ।

