আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। সেই আবহে ভারতীয় সমাজমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে চলছে কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ। আর সেই চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ট্রাম্পের নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে তাঁর নাম। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন মিমে দাবি করা হচ্ছে, ট্রাম্পের এখন জ্ঞানেশ কুমারকেই প্রয়োজন!
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ধাক্কা খেয়ে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে তাঁর মেয়াদের বাকি সময়টা ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করেই কাটাতে হবে তাঁকে। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় সমাজমাধ্যমের একাংশের কটাক্ষ, জ্ঞানেশ কুমার পাশে থাকলে হয়তো এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত না ট্রাম্পকে। আমেরিকার নির্বাচনী ফলাফলের সঙ্গে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে চলা বিতর্ককে মিলিয়ে এমনই ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করছেন অনেকে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করার এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দীপক এবং তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রও।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ছবি দিয়ে তৈরি মিম সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছেন মহুয়া। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মোদী ও ট্রাম্প হাত মেলাচ্ছেন। সেই ছবির উপরে লেখা, ‘জ্ঞানেশের নম্বর পাঠাব কি?’ মিমটির সঙ্গে মহুয়া লিখেছেন, ‘ফ্রান্ড ডোনাল্ড নিড্স জ্ঞ্যানু’। অর্থাৎ, বন্ধু ডোনাল্ডের জ্ঞানুকে প্রয়োজন। অন্য দিকে, অভিজিৎ দীপক কোনও মিম পোস্ট না করে লিখেছেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার ট্রাম্পের সঙ্গে কখনও এটা হতে দিতেন না।’’
তবে ট্রাম্পের কাছে জ্ঞানেশ কুমারের নাম একেবারে অপরিচিত নয়। গত অগস্টে ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নাম উল্লেখ করেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ভারতে বৈধ পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দেওয়ার নিয়মের প্রশংসা করে আমেরিকাতেও একই ধরনের আইন চালুর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি। সেই পোস্টের প্রসঙ্গ টেনেই এখন ট্রাম্পকে কটাক্ষ করছেন অনেকে।
ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী ট্রাম্পের সেই পুরনো পোস্টের খবরের শিরোনাম ভাগ করে লিখেছেন, ‘‘ভুলে যাবেন না, ট্রাম্প কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের প্রশংসা করেছিলেন। এর থেকেই জ্ঞানেশ সম্বন্ধে অনেক কথা বোঝা যায়।’’ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে মোদীর বয়ানে একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘দুঃখিত, বন্ধু! জ্ঞানেশকে তোমার কাছে পাঠাতে পারিনি। আসলে আমি নিজের দিকটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এখন তো এখানকার লোকজন ওকে ওর বাড়ির ভিতরেই আটকে রেখেছে। ফলে ও আমাকেও আর সাহায্য করতে পারছে না।’’
উল্লেখ্য, ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করতে গিয়ে গত অগস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া ভোটদানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, জ্ঞানেশ এক মার্কিন প্রশাসনিক আধিকারিককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমেরিকায় বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া কী ভাবে ভোট নেওয়া হয়। একই পোস্টে ট্রাম্প উল্লেখ করেছিলেন, ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনে ৬৪ কোটি মানুষ ভোট দিয়েছেন এবং ইমেলের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন এক শতাংশেরও কম ভোটার। তাঁর দাবি ছিল, প্রত্যেক ভোটারের কাছেই বৈধ পরিচয়পত্র ছিল। এই প্রেক্ষিতেই আমেরিকায় অবিলম্বে ‘দ্য সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন তিনি।
অন্য দিকে, ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বেআইনি ভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে এবং বিজেপিকে নির্বাচনী সুবিধা পাইয়ে দিতেই এসআইআর-কে হাতিয়ার করা হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে আন্দোলনও চলছে। এই সংক্রান্ত ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় তাই ভারতের রাজনৈতিক মহলেও নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দুই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে চলা বিতর্ককে এক সুতোয় গেঁথে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।

