পারস্য উপসাগরের রণকৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার পাল্টা অবরোধের জেরে চরম সংকটে পড়েছে ইরান। গত তিন সপ্তাহ ধরে ওমান উপসাগরে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ইরানের ৩১টি বিশালাকায় তেলবাহী ট্যাঙ্কার। পেন্টাগন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, এই অবরোধের ফলে তেহরানের তেল রফতানি ব্যবস্থা কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে।
বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে ইরান
সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিয়স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের জেরে ইতিমধ্যেই ইরানের প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা) ক্ষতি হয়েছে। ওমান উপসাগরে আটকে পড়া ৩১টি ট্যাঙ্কারে মজুত রয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লক্ষ ব্যারেল তেল। পেন্টাগনের দাবি, এই আর্থিক ধাক্কার পরিমাণ আগামী দিনে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সঞ্চয় সংকটে ‘ভাসমান ভাণ্ডার’ই ভরসা
রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইরানে উৎপাদিত তেলের সঞ্চয় হু হু করে বাড়ছে। কিন্তু স্থলভাগে তেলের বিশাল ভাণ্ডার মজুত রাখার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো না থাকায় ইরান এখন সমুদ্রের পুরনো জাহাজ বা ভেসেলে তেল ভরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
- পেন্টাগনের সতর্কবার্তা: বর্তমানে যে হারে তেল জমছে, তাতে আগামী এক মাসের মধ্যে ইরানের আর কোনও আধার খালি থাকবে না।
- ফলাফল: তেল সঞ্চয়ের জায়গা না থাকলে ইরানকে বাধ্য হয়ে অপরিশোধিত তেল উত্তোলন বন্ধ করে দিতে হতে পারে।
অবরোধ এড়াতে ঘুরপথ: ভারত-পাকিস্তান উপকূলে নজর
আমেরিকার নজরদারি এড়াতে ইরানের কিছু ট্যাঙ্কার অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ ঘুরপথ ব্যবহার করছে। জানা গেছে, এই জাহাজগুলি ভারত ও পাকিস্তানের উপকূল ঘেঁষে মালাক্কা প্রণালীতে পৌঁছাচ্ছে। সেখানে গভীর সমুদ্রে চিনের জাহাজে তেল স্থানান্তরিত করা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সময় ও খরচ— দুই-ই আকাশছোঁয়া।
ট্রাম্পের কড়া নির্দেশ ও সেন্ট্রাল কমান্ডের অবস্থান
পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজ আটকের নির্দেশ দেন। আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে: ১. নিরপেক্ষ অবরোধ: এই নিয়ম সব দেশের জাহাজের জন্যই প্রযোজ্য। ২. নিষেধাজ্ঞার আওতা: ইরানের কোনও বন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করলে বা সেখান থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলেই সেই জাহাজ আটক করা হবে। ৩. ব্যতিক্রম: যে সব জাহাজ ইরানের বন্দরের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক না রেখে সরাসরি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করবে, তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না মার্কিন সেনা।
পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া
পেন্টাগনের প্রেস সচিব জোয়েল ভালদেজ জানিয়েছেন, আমেরিকার এই অবরোধ ‘ঈপ্সিত প্রভাব’ ফেলেছে। তাঁর দাবি, এই আর্থিক অবরোধের ফলে ইরান আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি বা সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার ক্ষমতা হারাবে।
বর্তমানে ওমান উপসাগর সংলগ্ন জলসীমায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বড়সড় রদবদলের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ৪ মে ভোটের ফলাফল নিয়ে ব্যস্ততার মাঝেও আন্তর্জাতিক এই সংকটের দিকে নজর রাখছে ভারতের মতো আমদানিকারক দেশগুলি।

