শান্তিনিকেতনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সোনাঝুরি জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করতে এ বার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিল রাজ্য বন দফতর। সোমবার সকাল থেকেই জঙ্গল এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেখানে বুলডোজার চালিয়ে জঙ্গলের ভেতরে চারচাকা গাড়ি প্রবেশের প্রধান মাটির রাস্তাটি পুরোপুরি খনন করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাস্তাটি এখন সম্পূর্ণভাবে গাড়ি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। গাড়ি চলাচলের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ রুখতে রাস্তার ধারে থাকা বিভিন্ন হোটেল ও রিসর্টের বেআইনি বিজ্ঞাপনী সাইনবোর্ডগুলিও উপড়ে ফেলা হয়েছে।
কেন এই অভিযান?
বন দফতরের আধিকারিকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সোনাঝুরির জঙ্গলের ভেতরে অবাধে চারচাকা গাড়ি চলাচল করছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্লাস্টিক দূষণ এবং বনের জমি দখল করে গজিয়ে উঠছে বেআইনি নির্মাণ। এই সবের কারণে সোনাঝুরির আদি ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেই কারণেই এই দূষণ ও জবরদখল রুখতে এই পদক্ষেপ।
অভিযানের নেতৃত্ব: বন দফতরের রেঞ্জার জ্যোতিষ বর্মণের নেতৃত্বে সোমবার সকাল থেকে এই উচ্ছেদ ও খনন অভিযান শুরু হয়। শান্তিনিকেতনকে দূষণমুক্ত রাখার এই অভিযানে প্রশাসনিক সহায়তায় উপস্থিত ছিলেন শান্তিনিকেতন থানার ওসি অনন্যা দে।
খোয়াই হাট নিয়ে আইনি বিতর্ক
সোনাঝুরির ঐতিহ্যবাহী খোয়াই হাট নিয়েও বর্তমানে আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশিষ্ট পরিবেশকর্মী সুভাষ দত্ত জাতীয় পরিবেশ আদালতে (NGT) একটি মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বন দফতরের সংরক্ষিত জমিতে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক হাট বসার নিয়ম নেই। অথচ সমস্ত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বছরের পর বছর ধরে সোনাঝুরির বুকে ‘বেআইনি ভাবে’ এই হাট চালানো হচ্ছে। তবে এই মামলার চূড়ান্ত রায় এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
ঐতিহ্য হারিয়ে বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এক সময় শুধুমাত্র প্রতি শনিবার বিশ্বভারতীর কলাভবনের পড়ুয়া এবং স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীদের তৈরি হস্তশিল্প সামগ্রী নিয়ে অত্যন্ত ছোট পরিসরে এই হাট বসত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই হাটের চরিত্র বদলে গেছে। বর্তমানে এটি প্রতিদিনের একটি বড় বাণিজ্যিক হাটে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, আদিবাসী ও স্থানীয় শিল্পীদের সরিয়ে এই হাট এখন বহিরাগত বড় ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গিয়েছে এবং এখানে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনও হচ্ছে। একই সঙ্গে বনের জমি দখল করে একাধিক হোটেল ও রিসর্ট গড়ে তোলার অভিযোগও সামনে এসেছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপকে স্বাগত ব্যবসায়ী ও হাট কমিটির
বন দফতরের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপকে কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হাট কমিটি স্বাগত জানিয়েছে। খোয়াই হাট কমিটির সদস্য সুকেশ চক্রবর্তী এবং স্থানীয় হোটেল ব্যবসায়ী গণেশ ঘোষ এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জঙ্গলের ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং সোনাঝুরিকে বাঁচাতে চারচাকা গাড়ি প্রবেশ বন্ধ করার এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও জরুরি ছিল।

