ব্রিটেনের রাজপরিবারে অভূতপূর্ব সংকট। যৌন অপরাধে অভিযুক্ত মার্কিন ধনকুবের জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার জেরে অবশেষে গ্রেপ্তার হলেন ব্রিটেনের প্রাক্তন যুবরাজ অ্যান্ড্রু (বর্তমান নাম অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর)। বৃহস্পতিবার সান্ড্রিংহাম প্যালেস থেকে টেম্স ভ্যালি পুলিশ তাঁকে হেফাজতে নেয়। যদিও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে বিবৃতিতে সরাসরি তাঁর নাম না নিয়ে ‘ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারের কারণ ও পুলিশের ভূমিকা
টেম্স ভ্যালি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি পদে থেকে অসদাচরণের (Misconduct in public office) অভিযোগে এই গ্রেপ্তার। তবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে যে, ধৃত ব্যক্তি প্রিন্স অ্যান্ড্রু। বর্তমানে নরফক এবং বের্কশায়ারের বিভিন্ন ঠিকানায় তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। ২০১৩ সালের ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, চার্জ গঠন না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ অভিযুক্তের নাম প্রকাশ করতে পারে না, সেই নিয়ম মেনেই সরকারিভাবে নাম গোপন রাখা হয়েছে।
ফাঁস হওয়া ইমেল: বাকিংহাম প্যালেসে ‘মডেল সরবরাহ’
সম্প্রতি আমেরিকার বিচার বিভাগ এপস্টিন ফাইলের যে অংশ প্রকাশ করেছে, তাতে অ্যান্ড্রু ও এপস্টিনের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের কলঙ্কিত অধ্যায় সামনে এসেছে। ফাঁস হওয়া ইমেল অনুযায়ী:
- ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর: জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এপস্টিনকে বাকিংহাম প্যালেসে একান্ত নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান অ্যান্ড্রু।
- মডেল জোগান: ইমেলে এপস্টিন প্রস্তাব দেন জনৈক রাশিয়ান মডেলসহ তিন নারীকে সঙ্গে আনার জন্য। অ্যান্ড্রু তাতে সম্মতি দেন। পরের দিন সেই নৈশভোজকে ‘অত্যন্ত উপভোগ্য’ বলে অভিহিত করেন তাঁরা।
- রাশিয়ান ও রোমানিয়ান সংযোগ: ২৬ বছর বয়সী এক সুন্দরী রাশিয়ান তরুণীকে অ্যান্ড্রুর কাছে পাঠানোর প্রমাণ মিলেছে ইমেলে। এমনকি অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত ইমেল আইডিও ওই তরুণীকে দিয়েছিলেন এপস্টিন।
সরকারি নথি পাচারের অভিযোগ
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজকীয় ক্ষমতার অপব্যবহার। অভিযোগ উঠেছে, যুবরাজ অ্যান্ড্রু ব্রিটেনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন সরকারি নথি এপস্টিনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্যিক ও সরকারি পরিকল্পনার নথি এপস্টিনকে পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
রাজপরিবারের প্রতিক্রিয়া
ভাইয়ের এই গ্রেপ্তারের খবরে গভীর ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন রাজা তৃতীয় চার্লস। বাকিংহাম প্যালেস থেকে জানানো হয়েছে, রাজা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন এবং ‘আইন আইনের পথে চলবে’ বলে স্পষ্ট করেছেন। এর আগে ভার্জিনিয়া জিওফ্রে নামে এক মহিলার করা যৌন হেনস্থার মামলা থেকে বাঁচতে ২০২২ সালে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে আদালতের বাইরে সমঝোতা করেছিলেন অ্যান্ড্রু।
সম্পর্কের নেপথ্যে ‘তৃতীয় ব্যক্তি’
তদন্তে উঠে এসেছে ডেভিড স্টার্ন নামে এক ব্যক্তির নাম। যখন বিতর্ক দানা বাঁধছিল, তখন অ্যান্ড্রু ও এপস্টিন সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করে স্টার্নের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করতেন। এছাড়া অ্যান্ড্রুর প্রাক্তন স্ত্রী সারা ফার্গুসনও এপস্টিনের থেকে আর্থিক ও ব্যবসায়িক সুবিধা নিয়েছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
২০১৯ সালে জেল হেফাজতে এপস্টিনের রহস্যজনক মৃত্যুর পর মনে করা হয়েছিল এই অধ্যায় শেষ। কিন্তু অ্যান্ড্রুর গ্রেপ্তারিতে সেই ‘প্যান্ডোরার বক্স’ নতুন করে খুলে গেল, যা ব্রিটেনের রাজতন্ত্রের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

