চ‍্যাম্পিয়নের মতো খেলেই ফের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন কোহলির বেঙ্গালুরু! পর পর দু’বার, ঘরের মাঠে হার শুভমনের গুজরাতের

চ‍্যাম্পিয়নের মতো খেলেই ফের আইপিএল চ্যাম্পিয়ন কোহলির বেঙ্গালুরু! পর পর দু’বার, ঘরের মাঠে হার শুভমনের গুজরাতের

ঘরের মাঠে ১ লক্ষ ১০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের গর্জনও থামাতে পারল না রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (RCB) বিজয়রথ। ফাইনালের প্রতিপক্ষ গুজরাত টাইটান্সের ঘরের মাঠে খেলা হলেও, গ্যালারির প্রায় ৭০ শতাংশই ছিল বিরাট কোহলি ও আরসিবি-র লাল-কালো জার্সিতে মোড়া। টানটান উত্তেজনার ফাইনালে গুজরাতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (IPL) ইতিহাসে পর পর দু’বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল বেঙ্গালুরু। এই অভাবনীয় জয়ের ফলে মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ও রোহিত শর্মার পর অধিনায়ক হিসেবে পর পর দু’বার আইপিএল ট্রফি জয়ের নজির স্পর্শ করলেন বিরাট কোহলি। ফাইনালে আরও একবার দেখা গেল কোহলির চেনা ‘চেজ়মাস্টার’ রূপ, যাঁর অপরাজিত ৪২ বলে ৭৫ রানের ইনিংসে ভর করেই ট্রফি ধরে রাখল বেঙ্গালুরু।

রাসিখ-হেজ়লউডের দাপটে ১৫৫ রানেই থমকে গেল গুজরাত

এদিন মেগা ফাইনালে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক রজত পাটীদার। চলতি আইপিএলে গুজরাতের প্রায় ৬০ শতাংশ রান এসেছে শুভমন গিল ও সাই সুদর্শনের ব্যাট থেকে। ফলে আরসিবি বোলারদের মূল লক্ষ্যই ছিল এই দুই ইনফর্ম ব্যাটারকে দ্রুত ফেরানো। ফাইনালের পিচে সুইং কম থাকায় জশ হেজ়লউড ও ভুবনেশ্বর কুমার শর্ট বলের রণকৌশল বেছে নেন।

সেই পরিকল্পনা কাজে লাগিয়েই হেজ়লউডের বলে পুল মারতে গিয়ে ১০ রানে আউট হন গুজরাত অধিনায়ক শুভমন গিল। এরপর ভুবনেশ্বরের বাউন্সারে কুপোকাত হয়ে ১২ রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন সুদর্শন। পাওয়ার প্লে-র ধাক্কা সামাল দিতে ব্যর্থ হয় গুজরাতের মিডল অর্ডারও। নিশান্ত সিন্ধু (রাসিখের শিকার) এবং জস বাটলার (২৩ বলে ১৯) বড় শট খেলতে গিয়ে দ্রুত সাজঘরে ফেরেন। ক্রুণাল পাণ্ড্যর বুদ্ধিদীপ্ত বলে স্টাম্পড হন বাটলার। ছ’নম্বরে নামা আরশাদ খান ২টি ছক্কা মারলেও ১৫ রানে হেজ়লউডের বাউন্সারে আউট হন। রাহুল তেওতিয়াও (৭) ব্যর্থ হন।

একপ্রান্তে উইকেট পতন চললেও অন্য প্রান্ত আগলে লড়ে যান ওয়াশিংটন সুন্দর। ব্যক্তিগত ক্যাচ মিসের জীবনদান পেয়ে ৩৭ বলে ৫০ রানের এক দায়িত্বশীল ইনিংস খেলেন তিনি। জেসন হোল্ডার বা রশিদ খান তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দিতে না পারলেও, ওয়াশিংটনের অর্ধশতরানের ওপর ভর করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৫ রান তোলে গুজরাত টাইটান্স। আরসিবি-র পক্ষে বল হাতে সবচেয়ে সফল রাসিখ দার ৩টি উইকেট নেন। হেজ়লউড ও ভুবনেশ্বর পান ২টি করে উইকেট।

পাওয়ার প্লে-তেই জয়ের ভিত ও বেঙ্কটেশের আগ্রাসন

১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে খেলা শুরু করে আরসিবি। ওপেনার বেঙ্কটেশ আয়ার প্রথম ওভারেই মহম্মদ সিরাজের বলে হাঁটুতে গুরুতর চোট পান। তবে খোঁড়াতে থাকা অবস্থাতেই চোটকে সঙ্গী করে তিনি আরও আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন। অন্য প্রান্তে বিরাট কোহলিও কাগিসো রাবাডার এক ওভারে ৩টি চার ও ১টি ছক্কা মেরে হাত খোলেন। এই দুই ব্যাটারের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে মাত্র ৩.৩ ওভারেই ৫০ রানের গণ্ডি পার করে বেঙ্গালুরু। উইকেট নেওয়ার অতিরিক্ত তাগিদে লাইন-লেন্থ হারিয়ে বসেন গুজরাতের দুই প্রধান পেসার সিরাজ ও রাবাডার।

অবশেষে সিরাজের বলেই ক্যাচ দিয়ে আউট হন বেঙ্কটেশ (১৬ বলে ৩২)। এরপর দেবদত্ত পড়িক্কল মাত্র ১ রানে রাবাডার শিকার হন। তবে ২ উইকেট হারালেও পাওয়ার প্লে-র ৬ ওভারে ৭০ রান তুলে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় আরসিবি।

রশিদের স্পিন-ধাক্কা ও কোহলির ঠান্ডা মাথার ‘হিসাব’

ম্যাচে ফিরতে গুজরাত অধিনায়ক শুভমন গিল বল তুলে দেন দলের প্রধান অস্ত্র রশিদ খানের হাতে। অধিনায়ককে হতাশ না করে এক ওভারেই জোড়া উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনেন এই আফগান স্পিনার। রশিদের বলে ছক্কা মারতে গিয়ে লং-অনে ক্যাচ দেন আরসিবি অধিনায়ক রজত পাটীদার (১৫)। এরপর পাঁচ নম্বরে নামা গতবারের ফাইনালের ম্যান অব দ্য ম্যাচ ক্রুণাল পাণ্ড্যও মাত্র ১ রানে রশিদের বলে আউট হন।

১০০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে আরসিবি কিছুটা চাপে পড়লেও ক্রিজে অবিচল ছিলেন ‘চেজ়মাস্টার’ বিরাট কোহলি। ১০ ওভারে ১০০ রান তোলার পর বাকি ১০ ওভারে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৫৬ রান। ২৫ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন কোহলি, যা আইপিএলের ১৯ বছরের ইতিহাসে তাঁর দ্রুততম। গ্যালারিতে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের পাশে বসে ১৫ বছরের উদীয়মান ক্রিকেটার বৈভব সূর্যবংশীও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল কোহলির এই ম্যাচ জেতানো ইনিংস। উল্লেখ্য, বৈভবের দল রাজস্থান রয়্যালস ফাইনালে না উঠলেও এবারের অরেঞ্জ ক্যাপ (কমলা টুপি)-সহ একাধিক পুরস্কার জিতে নিয়েছে বৈভব।

১২ বল বাকি থাকতেই ছক্কায় বাজিমাত

পঞ্চম উইকেটে কোহলির সঙ্গে জুটি বেঁধে গুরুত্বপূর্ণ ২৪ রান করে ম্যাচ সহজ করে দেন টিম ডেভিড। আরশাদ খানের বলে ডেভিড যখন আউট হন, আরসিবি তখন জয়ের দোরগোড়ায়। ব্যক্তিগত ৬৩ রানের মাথায় শুভমন গিলের হাতে কোহলির একটি কঠিন ক্যাচ উঠলে আম্পায়ার আউট দেন, তবে রিভিউতে দেখা যায় বল মাটি ছুঁয়েছে। জীবনদান পেয়ে আর পিছনে ফিরে তাকাননি কোহলি। শেষ পর্যন্ত ১টি ছক্কা মেরে ১২ বল বাকি থাকতেই ৫ উইকেটে দলের জয় সুনিশ্চিত করেন তিনি। ৪২ বলে ৭৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন কোহলি। আরসিবি ব্যাটারদের হাত ধরে আরও একবার আইপিএলের ট্রফি গেল বেঙ্গালুরুতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.