দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ক্ষোভের যে ‘ঘূর্ণিঝড়’ আছড়ে পড়েছে, তা আদতে এক গভীর রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে গেল। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিপন্ন ও বিপর্যস্ত তৃণমূলের প্রতি সাধারণ মানুষের মানসিকতা কতটা বদলে গেছে, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ। রাজ্যজুড়ে তৃণমূল নেতাদের বিগত দীর্ঘদিনের বল্গাহীন দুর্নীতি এবং দাদাগিরির বিরুদ্ধে নীচুতলায় যে রোষ চাপা পড়ে ছিল, ভোটের ফল প্রকাশের পর সাহস পেয়ে তা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফেটে পড়ল।
মানুষের নাড়ি বোঝায় দক্ষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পরিস্থিতি নিশ্চিতভাবেই টের পাচ্ছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সোনারপুরে পাঠিয়ে তিনি মূলত ‘জল মেপে’ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারা— একদিকে অভিষেকের অন্তরাল নিয়ে ওঠা সমালোচনা থামানো, অন্যদিকে সিঁটিয়ে ঘরে ঢুকে যাওয়া দলীয় নেতা-কর্মীদের পথে ফিরিয়ে মনোবল চাঙ্গা করা। কিন্তু সেই কৌশল কেবল বিপর্যস্তই হয়নি, বরং জনরোষের তীব্রতায় তা বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় নেতৃত্বের ‘পলায়ন’ ও দলের অন্দরের ফাটল
সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচিতে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এক বড়সড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় তৃণমূল সূত্রে জানা গেছে, অভিষেক এলাকায় যেতে পারেন এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই জনতার মধ্যে ক্ষোভের পারদ চড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার সংশ্লিষ্ট ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর অনিতা বসু এবং তাঁর স্বামী তথা স্থানীয় তৃণমূল নেতা হেমন্ত বসু আগেভাগেই সস্ত্রীক বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
হেমন্ত বসু তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে দাবি করেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের দফতর থেকে যখন তাঁকে এই সফরে সঙ্গী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে এলাকার পরিস্থিতি অনুকূল নয় এবং তিনি যেতে পারবেন না। কিন্তু দফতর থেকে পাল্টা বলা হয়, “প্রত্যেকে পালিয়ে গেলে চলবে না, সঙ্গে থাকতে হবে।” শেষমেশ হেমন্ত বা অনিতা কেউই ওই কর্মসূচিতে ছিলেন না। শুধু তাঁরাই নন, পুরপ্রধান থেকে শুরু করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনও তৃণমূল বিধায়ক, সাংসদ বা সোনারপুরের দুই প্রাক্তন বিধায়ককেও অভিষেকের পাশে দেখা যায়নি। কেবল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি বলাই বারিক উপস্থিত ছিলেন, যাকে দেখিয়ে বিজেপি উল্টে অভিষেকের বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ নিয়ে এলাকায় ঢোকার পাল্টা অভিযোগ তুলেছে।
“ভোট-পরবর্তী হিংসা নয়, এটি স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ”
তৃণমূলের পক্ষ থেকে এই আক্রমণকে ‘বিজেপির পরিকল্পিত হামলা’ বলে দাবি করা হলেও, স্থানীয় সূত্র এবং ঘটনাপরম্পরা অন্য কথা বলছে। যে মৃত তৃণমূল কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে অভিষেক গিয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ মানুষের, বিশেষত মহিলাদের তীব্র ক্ষোভ ছিল। তৃণমূল সঞ্জুকে ‘ভোট-পরবর্তী হিংসার শিকার’ বলে দাবি করলেও, পাড়ার বাসিন্দারা তা সম্পূর্ণ নস্যাৎ করেছেন।
এলাকার গৃহবধূ অর্পিতা মণ্ডলের বিস্ফোরক দাবি: “এই পাড়ায় বিজেপির কোনও সংগঠনই তৃণমূল কোনদিন তৈরি হতে দেয়নি। সাধারণ মানুষ নিজের ইচ্ছায় গিয়ে এবার বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। এটি পুরোপুরি তৃণমূলের দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ। সঞ্জু আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিল। কিন্তু রাজনীতিতে ঢোকার পর থেকেই ও এলাকায় জমি দখল, এক জমি একাধিকজনের কাছে বিক্রি করা, মদের ঠেক বসানো এবং প্রকাশ্য গাঁজা খাওয়ার মতো অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে। ওর অত্যাচারে মেয়েরা দিনের বেলাতেও রাস্তায় বেরোতে ভয় পেত। এমন একজনের বাড়িতে অভিষেক আসছেন শুনেই মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।”
স্থানীয়দের দাবি, দিনকয়েক আগে ক্লাবের একটি গণ্ডগোলের পর আচমকা অসুস্থ হয়ে সঞ্জুর মৃত্যু হয়। তাকে রাজনৈতিক শহীদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার তৃণমূলী চেষ্টার বিরুদ্ধেই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সাধারণ মানুষ।
আক্রমণ নিয়ে বিজেপি ও লাভলি মৈত্রের চাপানউতোর
বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব অবশ্য এই হামলার ঘটনাকে কোনোভাবেই সমর্থন করেনি। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রবিবার বলেন, “এই ঘটনা সুস্থ সমাজের পক্ষে কাম্য নয়। তবে এর সঙ্গে বিজেপির দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও যোগ নেই। এটি পুরোপুরি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও মারামারির ঘটনা।”
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার দাবি করেন, হামলার ঘটনায় যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁরা সোনারপুর দক্ষিণের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক লাভলি মৈত্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যদিও লাভলি মৈত্র এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা কেউ তৃণমূলের নন, তাঁরা বিজেপির লোক। আমার কাছে এর ভিডিও ফুটেজ আছে এবং আমি পুলিশকে তা জানিয়েছি।” দলের নেতাদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি গত কয়েকদিন ধরে বাইরে থাকায় এই বিষয়ে মন্তব্য করবেন না।
ব্যর্থ ‘আক্রান্ত-তাস’ ও হাসপাতাল বিতর্কে মমতা
শনিবারের ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর চিরপরিচিত ‘আক্রান্ত-তাস’ খেলে সহানুভূতির হাওয়া তোলার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী শিবির। কিন্তু শহরের দুটি নামী বেসরকারি হাসপাতালই অভিষেককে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ছেড়ে দেওয়ায় সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
প্রথমে ইএম বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতাল স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে অভিষেকের চোট গুরুতর নয় এবং তাঁকে ভর্তি করার কোনও প্রয়োজন নেই। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে মিন্টো পার্কের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানে অভিষেকের জন্য ভিআইপি সুইট (VIP Suite) চাওয়া হলেও, তা খালি না থাকায় দেওয়া সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি চিকিৎসকেরা সাফ জানিয়ে দেন যে ভর্তির মতো কোনও শারীরিক পরিস্থিতি নেই।
শনিবার রাত থেকেই মিন্টো পার্কের ওই হাসপাতালের প্রবীণ সিইও (CEO) প্রদীপ টন্ডনের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিৎকার ও শাসানির ভঙ্গিতে কথা বলার একাধিক ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ভিডিওগুলিকে হাতিয়ার করে সুর চড়িয়েছে বিজেপি। দলটির দাবি, ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে পায়ে চোটের ঘটনার মতোই এবারও চিকিৎসকদের ওপর চাপ তৈরি করে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করেছিলেন মমতা, যা এবার ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, একদা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের ‘সেফ হাউস’ হিসেবে পরিচিত এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালের উডবার্ন ব্লকে কেন অভিষেককে নিয়ে যাওয়া হলো না? সরকারি হাসপাতালে এখন চাপ দিয়ে মনমতো রিপোর্ট করানো যাবে না বলেই কি বেসরকারি হাসপাতালকে বেছে নেওয়া হলো?
বিগত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি বর্তমানে মমতা ও অভিষেকের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। তবে রাজনৈতিক মহল মনে করে, পশ্চিমবঙ্গের ব্যতিক্রমী রাজনীতিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহজে হাল ছাড়ার নেত্রী নন। এই ঝুঁকি আগামীদিনে তৃণমূলের জন্য লাভজনক হবে নাকি ক্ষতিকর, তা অদূর ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে।

