কোনো পুলিশ আধিকারিক বা রুপোলি পর্দার সুপারহিরো নন; এক সাধারণ যুবকের অদম্য সাহসিকতার জোরেই সাত মাস ধরে ‘ফেরার’ থাকা খুনে অভিযুক্ত রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও (BDO) প্রশান্ত বর্মণকে গ্রেফতার করতে পেরেছিল নিউ টাউনের ইকো পার্ক থানার পুলিশ। কিন্তু গ্রেফতারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন এই প্রভাবশালী আমলা। আর তাতেই হতবাক ও হতাশ হয়ে পড়েছেন তাঁকে পাকড়াও করা সেই সাহসী যুবক।
সিনেমার কায়দায় ধাওয়া ও পাকড়াও
সাহসী এই যুবকের নাম সাকিল আহমেদ (৩০)। মুর্শিদাবাদের কান্দির বাসিন্দা সাকিল নিউ টাউন এলাকায় থেকে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সোমবার রাত ১০টা নাগাদ নিউ টাউনের ইকো পার্ক থানা এলাকায় এক বন্ধুর জন্য রেস্তরাঁর সামনে অপেক্ষা করছিলেন তিনি।
হঠাৎই একটি কালো রঙের বিলাসবহুল জিপগাড়ি এক পথচারীকে সজোরে ধাক্কা মারে। ধাক্কার তীব্রতায় মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের বাসিন্দা মোতালেব শেখ নামের ওই পথচারী ছিটকে এসে সাকিলের স্কুটারের ওপর পড়েন। দুর্ঘটনা ঘটিয়েই কালো গাড়িটি দ্রুত গতিতে পালানোর চেষ্টা করলে সাকিল নিজের স্কুটার নিয়ে সেটির পিছু নেন। প্রায় ১০০ মিটার যাওয়ার পর একটি ট্রাফিক সিগন্যালে অন্য গাড়ির পিছনে আটকে পড়ে ঘাতক গাড়িটি।
সাকিল কালবিলম্ব না করে নিজের স্কুটারটি জিপের সামনে আড়াআড়িভাবে দাঁড় করিয়ে চালকের দিকে এগিয়ে যান। চালকের আসনে বসা ব্যক্তিকে দেখেই চিনতে পারেন তিনি। সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সাকিল জানতেন, এই ব্যক্তি আর কেউ নন— স্বনামধন্য স্বর্ণব্যবসায়ী হত্যা মামলার অন্যতম মূল অভিযুক্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মণ।
ফেসবুক লাইভ ও হুমকি: প্রশান্ত বর্মণ অত্যন্ত প্রভাবশালী তা জানতেন সাকিল। তাই তিনি প্রভাব খাটিয়ে যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য সাকিল তৎক্ষণাৎ নিজের মোবাইল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করা শুরু করেন। লাইভ শুরু হতেই মত্ত অবস্থায় থাকা প্রশান্ত বর্মণ সাকিলকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে শুরু করেন, যা সাকিলের ক্যামেরায় বন্দি হয়।
ততক্ষণে সিগন্যালে কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরাও সেখানে চলে আসেন। প্রায় ২০ মিনিট পুলিশের সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার ও তর্কাতর্কির পর অবশেষে পুলিশের গাড়িতে ওঠেন প্রশান্ত। এরপর সাকিল আহত পথচারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান এবং রাত ২টো নাগাদ ইকো পার্ক থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
জামিন হতেই হতবাক সাকিল
বেপরোয়া গাড়ি চালানো এবং মদ্যপ অবস্থায় থাকার কারণে প্রশান্ত বর্মণের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ২৮১, ১২৫বি এবং মোটর ভেহিকল আইনের ১৮৪ ও ১৮৫ ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ। মঙ্গলবার তাঁকে বারাসত আদালতে হাজির করানো হয়।
আদালত সূত্রে খবর, শুনানির সময় বিচারক এই মামলার মূল নথি (কেস ডায়েরি) দেখতে চান। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট অপেক্ষা করলেও পুলিশের পক্ষ থেকে স্বর্ণব্যবসায়ী হত্যা মামলার নথি আদালতে পৌঁছায়নি। এর ফলে আইনি বাধ্যবাধকতায় আদালত থেকে সহজেই জামিন পেয়ে বাড়ি ফিরে যান প্রশান্ত বর্মণ।
এই খবর শুনে রীতিমতো স্তম্ভিত সাকিল আহমেদ। তিনি বলেন, “উনি প্রভাবশালী জেনেই আমি এগিয়েছিলাম। আমাকে হুমকি দিয়েছেন, আমার ছবিও তুলে রেখেছেন। তাও আমি ভয় না পেয়ে আইনের ওপর ভরসা করেছিলাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি উনি ছাড়া পেয়ে যাবেন, তা ভাবতেও পারিনি। আমি নিজে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমিও বিডিও হতে চাই, কিন্তু প্রশান্ত বর্মণের মতো দুষ্কৃতী হতে চাই না।”
কে এই প্রশান্ত বর্মণ? কেন তিনি পলাতক ছিলেন?
গত বছরের ২৯ অক্টোবর নিউটাউন থানার যাত্রাগাছির খালধার থেকে সল্টলেকের দত্তাবাদের বাসিন্দা তথা স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে অপহরণ করে খুন করা হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত রাজগঞ্জের তৎকালীন বিডিও প্রশান্ত বর্মণ।
নিম্ন আদালত থেকে তিনি আগাম জামিন পেলেও, বিধাননগর পুলিশ কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে উচ্চ আদালত তাঁর জামিন খারিজ করে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। গত ২৩ জানুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সেই কড়া নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গত সাত মাস ধরে পুলিশের নাগালের বাইরে ‘ফেরার’ ছিলেন এই সরকারি আধিকারিক। শেষ পর্যন্ত সোমবার রাতে এক সাধারণ যুবকের তৎপরতায় ধরা পড়লেও, পুলিশের গাফিলতি ও নথি সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে ২৪ ঘণ্টাও কাটল না— ফের মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন প্রশান্ত বর্মণ।

